বরিশাল বোর্ডে এসএসসিতে এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী এক-চতুর্থাংশ, বেড়েছে ঝরে পড়ার সংখ্যা
সারা দেশে ২১ এপ্রিল শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। তবে পরীক্ষার আগমুহূর্তে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে এসেছে। এবারের পরীক্ষার্থীদের প্রতি চারজনের একজন অনিয়মিত পরীক্ষার্থী; যারা আগের বছর অকৃতকার্য হয়ে আবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৮১ হাজার ৮৩১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ১৯ হাজার ৮২২ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জি এম শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ৩৬ হাজার ১৭৩ জন অকৃতকার্য হয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এবার আবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বাকি প্রায় ১৬ হাজার নতুন করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আর ফরম পূরণ করেনি।
বোর্ডের গত বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতায় বিভাগের ছয় জেলার মোট ১ হাজার ৪৯১টি বিদ্যালয় থেকে ৮৪ হাজার ৭০২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছাত্র ৩৯ হাজার ৫৪৮ জন এবং ছাত্রী ৪৫ হাজার ১৫৪। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় পাস করেছিল মাত্র ৪৬ হাজার ৭৫৮ জন। এসএসসি পরীক্ষায় এই বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছিল ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশে। ওই বছর মোট ৩৬ হাজার ১৭৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়।
গত বছর অকৃতকার্য হওয়া এই বিপুল শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষার হলে ফিরে এলেও বাকি প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী নতুন করে পরীক্ষার হলে ফিরছে না। ফলে এই ১৬ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়েছে, যা এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়াটা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ফল নয়; বরং এটা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন। বরিশালের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শাহ সাজেদা প্রথম আলোকে বলেন, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকটেরই ইঙ্গিত। প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর ফিরে আসা যেমন ইতিবাচক তেমনি ১৬ হাজারের ঝরে পড়াটাও ভীষণ উদ্বেগের। কারণ, বরিশাল অঞ্চলটি এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকির এলাকা। এসব কারণে এখানে বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, স্থানান্তর, পেশার পরিবর্তন জীবনযাপন ও শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই অভিঘাত মোকাবিলার জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে।
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ‘সেকেন্ড চান্স’ ব্যবস্থা, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে সহায়তা, রিমেডিয়াল ক্লাস ও কাউন্সেলিংয়ের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের এসব বিষয়ে ভাবতে হবে, উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে বাধ্য হয় উল্লেখ করে অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, এ জন্য নমনীয় ও বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা জরুরি, নইলে ঝরে পড়ার হার বাড়তেই থাকবে। কেননা শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা ও পুনরায় মূলধারায় ফেরানোর সক্ষমতাই শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত মান নির্ধারণ করে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫৭৬ জন। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজারে। আর লিঙ্গভিত্তিক তথ্যেও একটি বৈষম্য স্পষ্ট। গত বছর অনিয়মিতদের মধ্যে ছাত্র ছিল ৪ হাজার ৭৮০ জন এবং ছাত্রী ২ হাজার ৭৯৬ জন। অর্থাৎ অকৃতকার্য হয়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ছেলেদের হার তুলনামূলক বেশি।
বরিশালের অন্তত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের বড় অংশই আগেরবার এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। তাঁরা বলেন, এই শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা করে সহায়ক কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। এ জন্য অনেককেই নিজের উদ্যোগেই প্রস্তুতি নিতে হয়। যাঁরা সাহস, উৎসাহ ও উপযোগী পরিবেশ পায়, তারা আবার চেষ্টা করে এবং বেশির ভাগই তা পারে না।
বরিশাল নগরের এ কে ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক এইচ এম জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতায় নিকট অতীতে এত সংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা আমি দেখিনি। গত ১৫-১৬ বছরের থেকে গত বছর পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেকটা কড়াকড়ি অবস্থা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন তুলনামূলক কঠোর হওয়াতে ফলাফলে বিপর্যয় এনেছে। তবে এত বেশি শিক্ষার্থী এক বছরে ঝরে পড়া অশনিসংকেত।’
এই প্রধান শিক্ষক বলেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, মহামারির কারণে এ অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে। সংসারের দায় সামলে দিনের শেষে সীমিত সময় নিয়ে পড়াশোনায় ফেরার বাস্তবতায় তাদের লড়াই অন্যদের তুলনায় অনেক কঠিন। তবুও যারা ফিরেছে—এটা ইতিবাচক দিক। তাঁর মতে, সুযোগ পেলে আবার চেষ্টা করার মানসিকতা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই থাকে, যা এবারও প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের এই বড় উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—একবার পিছিয়ে পড়া মানেই চিরতরে ঝরে পড়া নয়। তবে বাস্তবতা হলো, ফিরে আসার পথ মোটেই সহজ নয়। এ জন্য শিক্ষকদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ প্রয়োজন।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী বলেন, ‘অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বড় অংশই গ্রামের। আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা বেশি। তাই জেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের নিয়ে আমরা এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কাজ শুরু করেছি। কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও সমাধানের পথ বের করা যায়, সে ব্যাপারেও ভাবা হচ্ছে।’