পথচারীদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে তালের রস, বাড়তি আয় গাছিদের
ভ্যানবোঝাই খড়ি নিয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে সঙ্গে করে বালিয়াকান্দি থেকে রাজবাড়ীর বানিবহ এলাকায় ফিরছিলেন চালক আকবর শেখ (৬০)। পথে রাস্তার ধারে তালের রস বিক্রি হতে দেখে তৃষ্ণা মেটাতে ভ্যান থামান। নিজে এক গ্লাস রস পান করার পর খাওয়ান স্ত্রী ও সন্তানকেও।
আকবর শেখ বলেন, এই পথে পণ্য পরিবহনের সময় গরমে তৃষ্ণা পেলে মাঝেমধ্যে রাস্তার ধারের তালের রস পান করেন। এতে ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়। তাঁর মতো আরও অনেক পথচারী ও যানবাহনের চালক চলতি পথে তালের রসে স্বস্তি খোঁজেন এই গরমে।
সম্প্রতি রাজবাড়ী থেকে বালিয়াকান্দি সড়কের বানিবহ থেকে বহরপুর পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জনকে তালের রস বিক্রি করতে দেখা যায়। কেউ নিজেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন, আবার কেউ গাছিদের কাছ থেকে কিনে বিক্রি করেন। অনেকে বাড়ির সামনেই বসে অবসর কাজে লাগিয়ে রস বিক্রি করছেন। এতে তাঁদের যেমন বাড়তি আয় হচ্ছে, তেমনি স্বস্তি পাচ্ছেন পথচারীরাও।
স্থানীয় লোকজনের তথ্যমতে, এ অঞ্চলে আছে সহস্রাধিক তালগাছ। বানিবহ ইউনিয়নের বশুপাড়ার বাসিন্দা আলামিন মল্লিক (৪৫) বলেন, তাঁর বাবা রমজান মল্লিকসহ পূর্বপুরুষেরা সবাই গাছি ছিলেন। তিনিও গত রমজান মাস থেকে তালের রস বিক্রি শুরু করেছেন। স্থানীয় এক ব্যক্তির দুটি তালগাছ থেকে প্রতিদিন দুই হাঁড়ি রস পান। প্রতিদিন এসব রস বিক্রি করে আয় হয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
আলামিন জানান, এক হাঁড়ি রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে প্রায় ২০০ টাকার খড়ি লাগে। দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ার পর এক কেজি গুড় পাওয়া যায়, যা বিক্রি হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। অথচ কাঁচা রস তেমন খরচ ছাড়াই হাঁড়িপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। পাঁচ সদস্যের সংসারের দৈনিক খরচ মেটানোর পরও প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা সঞ্চয় থাকে।
পথচারী শিউলি বেগম বলেন, মাঝেমধ্যে এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় তালের রস খান। গত বুধবার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের সবাই মিলে এক গ্লাস করে রস খেয়েছেন। গরমের মধ্যে এই রস শরীরকে বেশ প্রশান্তি দেয়।
বালিয়াকান্দির বহরপুর ইউনিয়নের রায়পুর এলাকায় রাস্তার পাশে বসে রস বিক্রি করছিলেন আবদুল ওহাব মোল্লা (৬০)। তিনি জানান, প্রায় ১০ বছর তালের রস সংগ্রহ করছেন। তাঁর তিনটি গাছ থেকে প্রতিদিন তিন হাঁড়ি রস পাওয়া যায়। প্রতিটি হাঁড়িতে ২০ থেকে ২২ গ্লাস রস হয়। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পর বাকি রসপ্রতি গ্লাস ২০ টাকা দরে বিক্রি করেন।
ওহাব মোল্লা বলেন, রাজবাড়ী–বালিয়াকান্দি সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। অনেকেই পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে রস খান। সকালে ও বিকেলে তিনি রস নিয়ে বসেন, কখনো বাজারেও বিক্রি করেন। গুড় তৈরির চেয়ে কাঁচা রস বিক্রি করে বেশি লাভ হওয়ায় এখন অনেক গাছিই রাস্তায় বসে রস বিক্রি করছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তা জাকারিয়া মণ্ডল দুই গ্লাস রস পান করার পর বলেন, এখন রসের মানও ভালো। এ অঞ্চলে প্রচুর তালগাছ আছে। মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন রস বিক্রি করেন। তাঁর মতো অনেকেই যাত্রাবিরতি দিয়ে তালের রস পান করেন।
বানিবহ বাজারের কাছে বাড়ির সামনে বসে দুটি প্লাস্টিকের জারে রস বিক্রি করছিলেন বৃদ্ধ আজগর আলী ও তাঁর স্ত্রী। আজগর আলী বলেন, তাঁদের নিজস্ব আটটি তালগাছ রয়েছে। ছয়-সাত বছর ধরে তিনি নিজেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। ছেলে–মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর দুজনে বাড়ির সামনে বসে রস বিক্রি শুরু করেছেন। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লিটার তালের রস বিক্রি করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় হচ্ছে তাঁদের।
আজগর আলীর বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর রোপণ করা আটটি তালগাছ। একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা আছে লম্বা বাঁশের খুঁটি, তাতে ঝুলছে মোটা রশি। সেই বাঁশ বেয়ে গাছের মাথায় উঠে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাতায়াতের জন্যও রাখা হয়েছে বাঁশের সংযোগ। গাছের মাথায় জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হাঁড়িতে জমে রস। এরপর তিনি প্লাস্টিকের জারে সংগ্রহ করেন। পরে রশিতে বেঁধে জার নিচে নামিয়ে রাস্তার ধারে টেবিলের ওপর সাজিয়ে বিক্রি করেন।
এ বিষয়ে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন এস এম মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হাঁড়ি বা পাত্রে রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হলে সাধারণত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। তবে এই রস প্রক্রিয়াজাত করে তাড়ি বা নেশাজাতীয় কিছু তৈরি করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, তালের রস পান করে জেলায় কোথাও অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তারপরও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগগুলোকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।