সাঁথিয়ায় শিক্ষার্থীদের চুল কাটার ধরন নির্ধারণ করে বিদ্যালয়ের নোটিশ, পক্ষে–বিপক্ষে আলোচনা
পাবনার সাঁথিয়ায় একটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের চুল কাটার নির্দিষ্ট ধরন বাধ্যতামূলক করে নোটিশ টাঙিয়েছে। এ নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা।
সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লিটন উদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ ৯ এপ্রিল বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয়। পরে সেটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ১৫ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত আদলে চুল ছেঁটে এবং হাত-পায়ের নখ কেটে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে হবে। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট কাটিংয়ের ছবি যুক্ত করা হয়েছে, যা অনেকটা ‘আর্মি কাট’-এর মতো।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্দেশনা না মানলে তা ‘প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাভঙ্গ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশক্রমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন পদক্ষেপে অভিভাবকদের বেশির ভাগই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট পোশাক ও পরিচ্ছন্নতার মতো চুলের কাটিংয়েও নিয়ম থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সমতা ও একধরনের ঐক্য বোধ তৈরি হয়। বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সেলিম রেজা বলেন, স্কুলে শৃঙ্খলা শেখানো জরুরি। নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলে ছেলেমেয়েরা সেটায় অভ্যস্ত হয়।
তবে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, চুলের ধরন নির্ধারণ করে দেওয়া ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, শৃঙ্খলা দরকার, কিন্তু চুলের স্টাইল নিয়ে শাস্তির হুমকি দেওয়া ঠিক নয়। এতে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ পড়তে পারে। এ ছাড়া অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও পাঠদানের গুণগত দিকের চেয়ে এমন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত।
ফেসবুকেও বিষয়টি নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। তবে বেশির ভাগই এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে প্রশংসা করেছেন। আহমেদ রাজু নামের একজন লিখেছেন, ‘ভালো সিদ্ধান্ত। ঢাকার নামী স্কুলগুলোতে ড্রেস কোড ও চুলের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’
অনিক মুনশি নামের একজন লিখেছেন, ‘এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। ডিজাইন নির্দিষ্ট করে না দিয়ে লিখে দিতে পারত, মার্জিত কাটিং হতে হবে। সুন্দর, মার্জিত ও পরিপাটি কাটিং দিতে হবে, এমনটাও লেখা যেত।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লিটন উদ্দিনের ভাষ্য, শিক্ষার পরিবেশ ঠিক রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে নয়।
এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, এটি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও জীবন গঠনে সহায়ক একটি উদ্যোগ। এ ধরনের বিষয় নিয়ে অযথা বিতর্কের কিছু নেই। মূলত শিক্ষার্থীদের নিয়মশৃঙ্খলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মমাফিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত করার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী চুল বড় রাখে, যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত নয়।
বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও একটি নির্দিষ্ট নিয়মের চর্চা শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁদের মতে, এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা, সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের পোশাক ও পরিপাটি উপস্থিতি শিক্ষার পরিবেশকে আরও সুশৃঙ্খল করে।
তবে একাংশ মনে করেন, নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, স্বাতন্ত্র্যবোধ ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটিও বিবেচনায় রাখা উচিত। তাঁদের মতে, শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।