রাজশাহীতে শিশুর পর এবার গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে মহিষের মৃত্যু
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর নরসিঙ্গর মৌজার শাহনাপাড়া গ্রামে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডি) গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে শনিবার বিকেলে একটি মহিষের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা এসে মহিষটি গর্তের ভেতর মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করে রাত আটটার দিকে চলে যান।
এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে সাজিদ নামে দুই বছরের এক শিশু গভীর নলকূপের একটি পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে যায়। ৩২ ঘণ্টার অভিযান শেষে ১১ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মহিষের মালিক বিকাশ খা খা বলেন, ‘বিকেলে হালের দুইটা বড় মহিষ ও একটা ছোট মহিষ নিয়ে মাঠে চরাতে যাচ্ছিলাম। এ সময় হালের একটা বড় মহিষ কূপের ভেতর পড়ে যায়। মহিষ কূপে পড়তে দেখেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। দুই বছর আগে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে মহিষ জোড়া কিনেছিলাম। এ জন্য একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণও নিয়েছিলাম। সেই ঋণের কিস্তি এখনো শোধ করতে পারিনি।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে বিএমডির অনুমতি নিয়ে ওই গ্রামে গভীর নলকূপ বসাতে এসেছিলেন গোদাগাড়ী উপজেলার মালিগাছা গ্রামের বাশির উদ্দিন ও আরও কয়েকজন।
কূপ খনন করার পর কোনো একটা জটিলতার কারণে নলকূপের জন্য বোরিং না করে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে কূপের মুখটি উন্মুক্তই রয়ে যায়। শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শাহনাপাড়া গ্রামে বিএমডির কূপের ওই পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে যায় মহিষটি। খবর পেয়ে গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা মহিষটি উদ্ধার করতে আসেন। কিন্তু প্রায় ৮০ ফুট নিচে পড়ে মহিষটি মারা যাওয়ার কারণে তাঁরা উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করে রাত আটটার দিকে চলে যান।
বিকাশের মেয়ে মন্দিরা খা খা বলেন, এই হালের মহিষ দিয়ে চাষবাস করে তাঁর বাবা তাঁদের পরিবারের আটজন সদস্যের সংসার চালান। সংসারে তাঁর প্রতিবন্ধী দাদাও রয়েছেন। সবার ভরণপোষণ নির্ভর করে এ হালচাষের ওপরে। গর্তে মহিষ পড়তে দেখেই বাবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের মহিষ ছাড়া আয়-রোজগারের আর কোনো উপায় নেই।
বিকাশের প্রতিবেশী সরল এক্কা বলেন, এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় একটি কূপ ফেলে রেখে যাওয়া একেবারে দায়িত্বহীনতার পরিচয়। বাড়ির পাশেই এভাবে গর্ত খুঁড়ে যাঁরা রেখে গেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাঁরা যদি গর্তটা ভরাট করতে না পারতেন বা এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাইতেন, তাহলে এলাকাবাসী তাঁদের সহযোগিতা করতেন। কিন্তু গর্তটি তাঁরা ভরাট করতেই আসেননি। মহিষটা ধরতে গেলে বিকাশ নিজেই পড়ে যেতেন কূপের ভেতর।
গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ রফিকুজ্জামান বলেন, তাঁরা চেষ্টা করলে কূপটা পানি দিয়ে ভরে দিলে মহিষের মৃতদেহ ভেসে উঠত। তখন তাঁরা মহিষটি উদ্ধার করতে পারতেন। কিন্তু মহিষের মালিক বলেছেন, মৃত মহিষ উদ্ধার করে কোনো লাভ নেই। সে জন্য তাঁরা অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করে চলে এসেছেন।
বিএমডির কাঁকনহাট জোনের সহকারী প্রকৌশলী হাবিবুল আহসান বলেন, নরসিঙ্গর মৌজায় গভীর নলকূপ বসানোর জন্য একটি কূপ খনন করা ছিল। তাঁর জানামতে, সেটি ভরাট করে ফেলার কথা। কিন্তু কেন ভরাট করা হয়নি, সেটি তিনি খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে চান।
জানতে চাইলে বাশির উদ্দিন বলেন, তিনিসহ কয়েকজন চাষি মিলে গভীর কূপ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেখানে পানির স্তর পাওয়া গেছে। বোরিং করার জন্য ৬০ ফুট গভীর কূপ খনন করা হয়েছিল। কিন্তু জমির মালিক আবদুর রহিম পরে বিএমডির কাছে কাগজপত্র সাবমিট করতে গড়িমসি করেন। তিনি কাগজপত্র জমা দিতে যাবেন এ ভরসায় তাঁরা রয়েছেন। এ জন্য কূপটি ভরাট করা হয়নি।