বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের ৩ গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছেন। সাত দিন ধরে প্রতিদিন দুই দফার জোয়ারে ভাসছেন এসব মানুষ। তাঁদের ঘের-পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, আমনের বীজতলা পচে গেছে। লোকজন বসতঘরে টিকতে না পেরে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে কিংবা উঁচু স্থানে।

তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের মমতাজ বেগম (৫০) বলেন, ‘সাত দিন ধইর্যা মোগো নাওয়া, খাওয়া, ঘুম কিচ্ছু নাই। দিন-রাইত খালি চুবানি খাইতে আছি।’

একই গ্রামের বৃদ্ধ জেলে আলী আহমেদ (৭০) বলেন, ‘পানিতে ঘরে তরাইতে পারি না। হেইতে বান্দার উফরে খুপরিতে আশ্রয় নিছি। খাওন নাই, খাওনের পানি নাই, রাইতে জোয়ারের ভয়তে ঘুমও আয় না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলোচ্ছ্বাস আগেও ছিল। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে সুরক্ষা দিতে ষাটের দশকে উপকূলে ১৩৯টি পোল্ডারের অধীনে বাঁধ নির্মাণ করে তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে সাগর ও এর সংযুক্ত নদ-নদীগুলোর উচ্চতা ১ মিটার পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে জোয়ারের উচ্চতাও বেড়েছে।

আর ষাটের দশকের সেই সুরক্ষা বাঁধগুলো এখন আর সেই উঁচু জোয়ারকে সামাল দিতে পারছে না। ফলে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। প্রতিবছর বাড়ছে প্লাবনভূমি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে।

পানি বিশেষজ্ঞ ও পাউবোর সাবেক আঞ্চলিক প্রধান প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান সরদার বলেন, ‘উপকূলের এ নতুন দুর্যোগ ভয়াবহ। কারণ, ষাটের দশকের বাঁধগুলো এখন আর কাজে আসছে না। কারণ, কয়েক দশকে সাগরের তলদেশের উচ্চতা ১ মিটার বেড়ে গেছে। নাব্য কমে যাওয়ায় নদীগুলোর বেসিনের এই জলস্ফীতি ধারণ করতে পারছে না। ফলে এমনটা হচ্ছে। এ জন্য আমাদের প্রস্তুতি দরকার। এটা রোধে অবশ্যই ইকো-ফিশ-নেভিগেশন ফ্রেন্ডলি অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। পরিকল্পনায় সেগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। বাঁধগুলোর উচ্চতা বাড়ানো খুব জরুরি।’

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গতকাল রোববারও বরিশালের আটটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি দুই নদীর পানি বিপৎসীমার সমান্তরালে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ভোলা খেয়াঘাট এলাকার তেঁতুলিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার সমান্তরালে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে এক সপ্তাহ ধরে বরিশাল অঞ্চলে ধারাবাহিক উঁচু জোয়ারের তাণ্ডব, দমকা বাতাস, রোদ-মেঘ এবং মাঝেমধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হলেও কমছে না গরমের তীব্রতা।

বরিশাল আবহাওয়া বিভাগ বলছে, ৮ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত বরিশালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ থেকে ৩৪ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করলেও অনুভূত তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি। কিন্তু এই সময়ে এ অঞ্চলে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকার কথা ৩০ দশমিক ৮ ডিগ্রি। একই সঙ্গে এই সময়ে আকাশে গাঢ় মেঘের আনাগোনা থাকলেও বৃষ্টি হয়েছে সামান্য। এই সময়ে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২৪ ঘণ্টায় ২ দশমিক ২ মিলিমিটার থেকে সর্বোচ্চ ৫ মিলিমিটার। কিন্তু এই সময়ে দৈনিক এ অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ১২ দশমিক ৮ মিলিমিটার থেকে ১৪ দশমিক ৪ মিলিমিটার।

বরিশাল আবহাওয়া বিভাগের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আবদুল কুদ্দুস গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরেই আবহাওয়ায় অস্বাভাবিকতা বিরাজ করছে। এখন বৃষ্টির মৌসুমে দৈনিক স্বাভাবিক যে বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। আবার তাপমাত্রাও ঊর্ধ্বমুখিতায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন