সচ্ছলতার আশায় ধারদেনা করে গিয়েছিলেন বিদেশে, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

প্রায় চার মাস পর শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কফিন ধরে স্বজনদের আহাজারি। রোববার সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রায় তিন বছর আগে লেবাননে গিয়েছিলেন শুভ কুমার দাস। তাঁকে বিদেশে পাঠাতে জমি বিক্রির পাশাপাশি চার লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন ভ্যানচালক বাবা। শুভ প্রতি মাসে লেবানন থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা করে দেশে পাঠাতেন। সেই টাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ভাইবোনের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত।

শুভর পরিবারের সেই স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছে। গত ১১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ইসরায়েল সীমান্তবর্তী মাইফাদুন এলাকায় কর্মস্থলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন শুভ। প্রায় চার মাস পর আজ রোববার সকালে তাঁর মরদেহ সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এ সময় পরিবার ও স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শুভর বাবা সুরঞ্জন দাস ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। স্ত্রী শিখা রানী দাস ও চার সন্তানকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। বড় ছেলে শান্তি দাস বিয়ে করে আলাদা থাকেন। মেয়ে সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে সুদীপ দাস স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মেজ ছেলে শুভকে লেবাননে পাঠাতে জমি বিক্রি করার পাশাপাশি সমিতি ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে চড়া সুদে চার লাখ টাকা ধার করেন সুরঞ্জন দাস। জমি বিক্রির পর গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় ওঠে পরিবারটি। মাসে এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে সেখানে থাকেন। লেবাননে একটি বাড়ি ও ফলের বাগান দেখাশোনা করতেন শুভ। সেখান থেকে শুভ প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেশে পাঠাতেন। শুভর আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পরিবারটি।

শুভর মা শিখা রানী দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসারের হাল ফেরাতে গিয়ে বিয়ে না করেই লেবাননে গিয়েছিল শুভ। ভেবেছিলাম, আরও কিছুদিন থাকার পর দেশে নিয়ে এসে শুভকে বিয়ে দেব। ভগবান বুঝি আমাদের সুখ সহ্য করতে পারলেন না। তাই এভাবে আমার ছেলেটাকে কেড়ে নিলেন।’

শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারি। রোববার সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপতিপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গত ১০ মে রাতে শুভর সর্বশেষ কথা হয়। শুভর বোন সাধনা দাস বলে, ১২ মে দুপুরে মুঠোফোনে তাঁরা ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ইসরায়েল সীমান্তবর্তী মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় শুভ নিহত হন। ঘটনার দুই দিন পর ১৩ মে লেবাননের সেনাবাহিনী ও রেডক্রসের সহায়তায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নাবাতিয়ে এলাকার নাযদ হাসপাতালের মর্গে মরদেহটি রাখা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, শুভর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে আবেদন করা হয়। এরপর বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাস লেবানন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু ঘটনাস্থলে লেবানন সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে মরদেহ দেশে পাঠাতে দীর্ঘ সময় লাগে। পরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে শুভর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

খুলনা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. খালেদুর রহমান বলেন, শুভর পরিবার বিমানবন্দর থেকে ইতিমধ্যে ৮৫ হাজার টাকা পেয়েছে। তিনি বলেন, শুভ বৈধ পথে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারির পর বিদেশে গিয়ে থাকলে মোট ১৩ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা পাবেন। তবে ২০২৩ সালের আগে বিদেশ গিয়ে থাকলে সহায়তার পরিমাণ হবে ৩ লাখ টাকা। এ জন্য শুভর বিএমইটি নিবন্ধন ও বিদেশ যাওয়ার তথ্য যাচাই করা হবে।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, শুভ যে এলাকায় মারা গেছেন, সেটি ইসরায়েল সীমান্তের খুব কাছে। সেখানে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে দেরি হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মরদেহ দেশে পাঠাতেও সময় লেগেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করলে পরিবার সরকারি সহায়তা পাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব, তা করা হবে।