সুন্দরবনের পাশে মৌচাষ, জীবনের ঝুঁকি ও বনের ওপর চাপ কমছে
খুলনার কয়রা উপজেলার বানিয়াখালী গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কয়রা নদীর ওপারেই বিস্তৃত সুন্দরবন। নদীর তীরঘেঁষা বেড়িবাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে সারি সারি কাঠের মৌবাক্স। চারপাশে গুনগুন শব্দ তুলে উড়ছে মৌমাছি। বাক্সের ছোট ছিদ্র দিয়ে তারা কখনো ভেতরে ঢুকছে, কখনো বাইরে আসছে।
২৩ এপ্রিল সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। মৌবাক্সগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিফাত হোসেন জানান, এগুলো তাদের মৌমাছির ঘর। ভেতরে জমা হচ্ছে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুলের মধু। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আর বনের ভেতরে যাই না। বনের পাশেই বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছি।’
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা থেকে আসা মৌচাষিদের একটি দল বর্তমানে কয়রার বানিয়াখালী গ্রামের নদীপাড়ে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। তাদের ৪০০টি মৌবাক্সের মধ্যে ১২০টি রাখা হয়েছে এই এলাকায়। প্রায় ২৫ দিন ধরে তারা এখানে মধু সংগ্রহ করছেন। এই উদ্যোগের মূল উদ্যোক্তা মোমিনুর রহমান।
তীব্র রোদ ও গরম থেকে মৌমাছিকে রক্ষা করতে মৌবাক্সের ওপর খড় ও চটের বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে। নিয়মিত পানি ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। যাতে ভেতরের তাপমাত্রা সহনীয় থাকে। একটি বালতি থেকে পানি ঢালতে ঢালতে মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, ‘মৌমাছিদের সুস্থ রাখতে আমাদের অনেক যত্ন নিতে হয়। না হলে উৎপাদন কমে যায়।’
রিফাত হোসেন বলেন, মৌমাছিরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে অন্তত তিন কিলোমিটার পর্যন্ত ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। কয়েক দিন আগে মৌবাক্স থেকে তারা প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। এখন সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফুটতে শুরু করায় উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
মৌচাষিরা বলছেন, সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে মধু সংগ্রহ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাঘ, জলদস্যু ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে অনেকেই এখন বনসংলগ্ন এলাকায় মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। এতে ঝুঁকি যেমন কমছে, তেমনি বনের ওপর চাপও হ্রাস পাচ্ছে।
রিফাত জানান, ৪০০টি মৌবাক্সের পেছনে বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছর তাঁদের আয় হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে মৌচাষের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিকে চিনি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এক মৌসুমে কয়েক বস্তা চিনি প্রয়োজন পড়ে। পাশাপাশি প্রতিটি বাক্সে রানী মৌমাছি থাকা বাধ্যতামূলক, না থাকলে শ্রমিক মৌমাছিরা অন্যত্র চলে যায়।
কথার ফাঁকে সেখানে এসে যোগ দেন আরেক মৌচাষি রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনটা স্থির না—যেখানে ফুল, সেখানেই যেতে হয়।’ চলতি মৌসুমে তাঁরা প্রথমে নাটোরে লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করেছেন। পরে ঈশ্বরদী হয়ে এখন এসে পৌঁছেছেন সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কয়রায়। ফুলের প্রাপ্যতা অনুযায়ী জায়গা বদল করাই তাঁদের পেশার নিয়ম।
রবিউল ইসলাম জানান, মৌমাছি সুস্থ থাকলে এবং সুন্দরবনে কেওড়া-বাইনের ফুল ভালোভাবে ফুটলে পুরো মৌসুম এখানেই কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
কয়রার সুন্দরবন ঘেঁষা শাকবাড়িয়া নদীর তীরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে কাজ করছেন মৌচাষিরা। বাক্সের মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও দেখার মতো। মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা হয় বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে। বাক্স থেকে চাকের ফ্রেম বের করে মেশিনে ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হয়। পরে সেই চাক আবার বাক্সে ফিরিয়ে দিলে মৌমাছিরা নতুন করে মধু জমাতে শুরু করে।
শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী ৪ নম্বর কয়রা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মৌচাষি ইসরাফিল হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা মৌচাকের ফ্রেম খুলে পরিচর্যা করছেন। তাঁর সহকর্মী আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বাক্সে সাত থেকে আটটি চেম্বার থাকে এবং গড়ে দুই থেকে আড়াই কেজি মধু পাওয়া যায়।
ইসরাফিল হোসেন জানান, তাঁর এখানে ১৬০টি মৌবাক্স রয়েছে। খলিসা ও গরান ফুলের মধু ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে, সামনে কেওড়া ও বাইন ফুল থেকে আরও বেশি মধু পাওয়ার আশা রয়েছে।
ইসরাফিল বলেন, ‘মৌমাছিরা যখন চাকের ছিদ্র সিল করে দেয়, তখন বুঝি মধু পরিপক্ব হয়েছে—এটাই গ্রেড-এ মধু।’ মধু বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি জানান, পাইকারি দরে প্রতি মণ প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং খুচরায় কেজি প্রতি প্রায় এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বেশির ভাগ মধু ঢাকাসহ বড় শহরে চলে যায়।
আরেক মৌচাষি আলমগীর হোসেন জানান, তাঁরা জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে মৌবাক্স বসান। উৎপাদিত মধুর একটি অংশ জমির মালিকদেরও দিতে হয়। তাঁর ভাষায়, ‘বনের ভেতরে যাওয়ার চেয়ে এখানে কাজ অনেক সহজ ও নিরাপদ।’
বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ‘এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমছে এবং মৌয়ালদের ঝুঁকিও হ্রাস পাচ্ছে।’ তিনি জানান, কয়রায় এবার প্রথমবারের মতো একটি বেসরকারি সংস্থা সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামের প্রায় ২০০ জন মানুষের মধ্যে ২০০টি মৌমাছির বাক্স বিতরণ করেছে।
বন কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে কয়রার মঠবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির পেছনে কয়েকটি মৌমাছির বাক্স ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ। বাক্স থেকে মৌচাকের ফ্রেম বের করে ব্রাশ দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে মেশিনে বসানো হচ্ছে। এরপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাক থেকে মধু আলাদা করা হচ্ছে।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী। তিনি মধুর স্বাদ নিয়ে বলেন, ‘একেবারেই সুন্দরবনের মধুর মতো লাগছে। এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বনে না গিয়েও সুন্দরবনের মধু আহরণের একটি নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প তৈরি হচ্ছে।’
কয়রা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল গফফার প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাইরের মৌচাষিরা এখানে কাজ করলেও কয়রার স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ছিল না। তবে এবার এবার ‘প্রত্যাশী’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ২০০ জনকে মৌবাক্স ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।