কখনো কৃষিশ্রমিক, আবার কখনো ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন আবদুল কাদের। চারজন মানুষের সংসারে একমাত্র উপার্জন করা মানুষ তিনি। যা আয় করেন, তা দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে চারজন মানুষের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
আবদুল কাদেরের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার হারিয়াগাছি গ্রামে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নওগাঁ সদর উপজেলার দিঘলীর বিল এলাকায় যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয়, তখন তিনি সড়কের পাশে কাস্তে হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘বিলের মধ্যে হামাগের দল ধান কাটোছে। আরও দুইটা কামের (শ্রমিক) লোক আসোছে। ওরা জমি চিনে না। ওদের লিয়ে যাওয়া লাগবে। সেই জন্য সড়কত বসে আছি।’
আবদুল কাদেরের বয়স কত, সঠিকভাবে বলতে পারলেন না তিনি। জানতে চাইলে বলেন, ‘বয়স ৫২-৫৫ হবে। যুদ্ধের সময়ের কথা ভালো করে মনে আছে। ওই সময় ছয়-সাত বছর বয়স আছিল।’ তাঁর এ কথায় ধারণা পাওয়া যায়, বর্তমানে তাঁর বয়স ৫৮-৬০ হতে পারে।
কথায় কথায় আবদুল কাদের জানান, স্ত্রী জুলেখা খাতুন আর চার মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই মেয়ে বিবাহযোগ্য হলেও এখনো বিয়ে দিতে পারেননি। আর্থিক অনটনের কারণে মেয়েদের প্রাথমিকেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘হামি গরিব ঘরের সন্তান। ছোটবেলা থ্যাকেই অভাব–অনটনে বড় হইছি। হামার ছলেরা তা–ও স্কুলের বারান্দাত য্যাতে পারিছি। হামি সেই সুযোগটাও পাইনি। জমিজমা বলতে মাথাগোঁজার মতো একটা মাটি আর টিনের চালার বাড়ি ছাড়া আর কিছু নাই। ১২-১৩ বছর বয়স থ্যাকেই বাপের সঙ্গে মানুষের জমিত দিনমজুর হিসেবে কৃষিকাজ করি। এখনো বাপের পেশাতেই আছি। যখন এলাকাত কোনো কৃষিকাজ থাকে না, তখন ভ্যান চালাই।’
দিনমজুর হিসেবে কৃষিকাজ করে আর ভ্যান চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে এই বাজারে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানান আবদুল কাদের। তিনি বলেন, ‘কৃষিকাজ করলে দিনে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হয়। আর ভ্যান চালালে কোনো দিন তিন শ টাকা আয়, হয়তো কোনো দিন হাজার টাকা। জিনিসপত্রের যে দাম, যে আয় হয়, সেটা কোনো রকম খ্যায়ে-পরেই শ্যাষ। কোনো সঞ্চয় হয় না। মেয়ে দুটাক বিয়া দিলে যে খরচ হবে, সেই টাকা কামাই করার কোনো উপাই নাই। এদিকে মেয়ে দুইটার বিয়ার বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। বিয়ার ঘর আসে কিন্তু হামার অবস্থা দেখে সেই ঘর চলে যায়। গরিব ঘরের ছাওয়ালেক (সন্তান) কে বিয়া করবে?’
কথায় কথায় আবদুল কাদের আরও বলেন, ‘যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকম খ্যায়ে-পরে ব্যাঁচি আছি। একলা মানুষের আয় দিয়ে খাওয়া-পরাই ঠিকমতো হয় না। বয়স হয়ে গেছে। ভারী জিনিস চ্যাড়ে চ্যাড়ে (বহন করে) কোমরের ব্যথা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে কোমরের ব্যথায় কাজকাম করতে পারি না। এদিকে শ্বাসকষ্টের রোগও হইছে। শ্বাসকষ্টের জন্য সারা বছর ওষুধ খ্যাতে হয়। দিনে একটা মানুষ কাম করে ছয়-সাত শ টাকা আয়। এই টাকায় সংসারের সব ব্যয় নির্বাহ করার পর নিজের জন্য ওষুধ কিনার জন্য টাকা থাকে না। এদিকে ওষুধ না খাইলেও লয়। ওষুধ না খাইলে শরীর চলে না, শাসকষ্ট ব্যাড়ে যায়। যতক্ষণ শরীর ভালো আছে, ততক্ষণ সংসার চলবে।’