১২০ বছর ধরে রাজবাড়ী থেকে মেদিনীপুরে যায় ওরস স্পেশাল ট্রেন
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে রাজবাড়ী থেকে একটি বিশেষ ট্রেন ভারতের মেদিনীপুরে যায়। নাম ‘ওরস স্পেশাল ট্রেন’। উদ্দেশ্য মেদিনীপুরের জোড়া মসজিদের ওরস শরিফে যোগদান। ১৯০২ সাল থেকে প্রতিবছর ওরসে যোগ দিতে ভারতে যান বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। আঞ্জুমান-ই-কাদেরিয়ার তত্ত্বাবধানে গত মঙ্গলবার রাত ১০টায় এমনই একটি বিশেষ ট্রেন রাজবাড়ী থেকে মেদিনীপুরের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
আঞ্জুমান-ই-কাদেরিয়ার রাজবাড়ী কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রতিবছর অক্টোবর মাসে ওরস শরিফে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য আবেদনপত্র ছাড়া হয়। বিভিন্ন খানকায় জানানোর পাশাপাশি রাজবাড়ীতে মাইকিং করা হয়। রাজবাড়ী, পাবনা, ফরিদপুর, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ভক্তরা সেখানে আবেদন করেন। পরে লটারির মাধ্যমে বাছাই করার পর ভিসার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এবার ভিসা ও ট্রেনে যাতায়াত বাবদ ভক্তদের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। আর যাঁদের ভিসা আছে, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৪৫০ টাকা। আঞ্জুমান-ই-কাদেরিয়া কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। শুধু আঙুলের ছাপ দিতে ভক্তদের ঢাকায় যেতে হয়। তাঁদের সাধারণত এক মাসের বিশেষ ভিসা দেওয়া হয়।
আঞ্জুমান-ই-কাদেরিয়ার রাজবাড়ী জেলা কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, ট্রেনটি প্রতিবছর রাত ১০টায় রাজবাড়ী থেকে ছেড়ে যায়। সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের মেদিনীপুরে পৌঁছানোর কথা। শুক্রবার দিবাগত রাতে ওরস। পরদিন রাত ১০টায় ভারত থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে ট্রেনটি। করোনার কারণে গত দুই বছর ও ১৯৭৫ সালে একবার বিশেষ ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব আরও বলেন, ‘আমি ১৯৮০ সাল থেকে ট্রেনে ওরস শরিফে যাতায়াত করছি। মাঝে কয়েক বছর যেতে পারিনি। এ পর্যন্ত মোট ৩১ বার গিয়েছি। আমার পরিবারের সদস্যরাও ওরস শরিফে যান। এবার আমার স্ত্রী গিয়েছেন। আমি এখানে দায়িত্ব পালন করায় যেতে পারিনি।’
সংগঠনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৩২তম এবং বড় পীর আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর ১৯তম বংশধর আলী আবদুল কাদের সামশুল কাদের হজরত সৈয়দ শাহ মোর্শেদ আলী আল কাদেরী আল হাসানী আল হুসাইনী আল বাগদাদি আল মেদিনীপুরী (রহ.)-এর ১২২তম বার্ষিক ওরস অনুষ্ঠিত হবে কাল শুক্রবার। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের জোড়া মসজিদে অনুষ্ঠেয় ওরস পরিচালনা করবেন মহানবীর ৩৬তম ও বড় পীরের ২৩তম বংশধর হজরত সৈয়দ শাহ ইয়াসুব আলী আল কাদেরী আল হাসানী আল হুসাইনী আল বাগদাদি আল মেদিনীপুরী। এ উপলক্ষে রাজবাড়ী থেকে ২ হাজার ১৮২ জন যাত্রী নিয়ে মেদিনীপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায় ‘ওরস স্পেশাল ট্রেন’। ২৪টি বগিসংবলিত ট্রেনটিতে যাত্রীদের মধ্যে আছেন ১ হাজার ২৬৬ পুরুষ, ৮৪১ নারী ও ৭৫ শিশু।
রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার তন্ময় কুমার দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ওরস উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে ভারত থেকে ২৪টি কোচ আসে। ২০২০ সালের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের বগিতে যাতায়াত করা হতো। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে ভারত সরকার কোচ পাঠায়। তবে দর্শনা রেলস্টেশন পর্যন্ত তাঁদের (বাংলাদেশ) ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। এরপর ভারতীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটি মেদিনীপুরে যাবে। ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নুরুল ইসলাম ও শামীম আহমেদ। ট্রেনটিতে চালক হিসেবে আছেন লোকো মাস্টার প্রথম আবুল কাশেম এবং সহকারী রাজিবুল ইসলাম। ট্রেনটি মঙ্গলবার রাত ১০টায় ছেড়ে গেছে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজবাড়ী রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ওরস উপলক্ষে বিশেষ ট্রেনটি সাজানো হয়। বিকেল থেকে ট্রেন দেখতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হাজির হন। রেলস্টেশন এলাকায় অন্তত ১০ হাজার মানুষের সমাগম হয়। ওরস যাত্রীদের বিদায় দিতে জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার রেলস্টেশনে উপস্থিত হন।
রাজবাড়ীর রামকান্তপুর ইউনিয়নের চরবাগমারা গ্রামের লুৎফর রহমান এবার দিয়ে ১২ বার ওরসে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হুজুর পাকের ওরস শরিফে যাচ্ছি। সেখানে গেলে আমার খুব ভালো লাগে। এ জন্য সুযোগ পেলেই ওরস শরিফে যাই। আল্লাহ চাইলে আবার যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’
হোটেল শ্রমিক জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কয়েকবার ওরস শরিফে গিয়েছি। তবে প্রতিবছর গিয়েছি বাসে। এবারই প্রথম ট্রেনে যাচ্ছি। অনেক লোকজন একসঙ্গে যাচ্ছি। সঙ্গে অনেক মুরব্বি আছেন। ছোট–বড় অনেক মানুষ। সবার সঙ্গে একটি পবিত্র কাজে যেতে পেরে ভালো লাগছে।’