মাঠে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন

দুটি আসনে বিএনপি-জামায়াত এবং একটি আসনে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনার কথা বলছেন ভোটাররা।

নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর আগে পিরোজপুরের তিনটি আসনের প্রার্থীরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, দলীয় সভা এবং নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে মাঠে সক্রিয় আছেন। গত রোববার শীতের সকালে পিরোজপুর শহরের পৌরসভা ভবনের বিপরীতে একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন ব্যক্তি চা পান করতে করতে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলেন। একপর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে কথা তোলেন এক তরুণ। বলছিলেন, ‘এখনো তো মাঠে ভোটের কোনো পরিবেশই টের পাই না।’ আরেকজন বলছিলেন, প্রচার শুরু হলে হয়তো পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে। সেখানে থাকা একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বলেন, ‘এবার মানুষের মধ্যে ভোটের অনুভূতি কেন জানি কম।’

সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর জেলায় সংসদীয় আসন আছে তিনটি। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় তিনটি আসনে মূলত বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যেই নির্বাচনী রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুটি আসনে বিএনপি-জামায়াত এবং একটি আসনে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা আছে।

পিরোজপুর-১ (সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী)

বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপির প্রার্থী সাবেক জেলা আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন ও জামায়াতের প্রার্থী প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী। অতীতে বেশির ভাগ সময় এ আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতের জন্য আসনটি ছেড়ে দেয়। ওই দুই নির্বাচনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সংসদ সদস্য (এমপি) হন।

বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলেন, বিএনপি শুরুতে শরিক জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারকে প্রার্থী করলেও বার্ধক্যের কারণে তিনি নির্বাচনে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে আলমগীর হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব ফিরে এসেছে। জামায়াত প্রার্থী মাসুদ সাঈদী তাঁর বাবার রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইমেজ কাজে লাগিয়ে এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে এই আসনে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।

প্রচার শুরু হওয়ার আগেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে বিভিন্ন মাধ্যমে আগাম প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষকেরা নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন। এসব বন্ধ না হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা যাবে না। জবাবে মাসুদ সাঈদী বলেন, বিএনপি প্রার্থীই ধারাবাহিকভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। এ পর্যন্ত তাঁরা তিনটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

পিরোজপুর-২ (কাউখালী, ভান্ডারিয়া ও নেছারাবাদ)

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের ছেলে আহাম্মেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন। জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আরেক ছেলে শামীম সাঈদী। এ আসনে ১৯৮৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাতটি নির্বাচনে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এবার তিনি প্রার্থী না হওয়ায় ভোটের লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এ আসনে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী মাহিবুল হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ, এবি পার্টির প্রার্থী ফয়সাল খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেনের মনোনয়ন বাতিল করা হলেও তিনি আপিল করেছেন।

পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া)

ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। তবে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন মাত্রা যোগ করেছেন সাবেক এমপি রুস্তুম আলী ফরাজী। তিনি সম্প্রতি চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগ দিয়েছেন। অতীতে তিনি এ আসন থেকে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

ভোটারদের একটি অংশ মনে করছেন, জামায়াত যদি জোটসঙ্গী হিসেবে আসনটি ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়ে দেয়, তাহলে ফরাজীই হবেন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। সে ক্ষেত্রে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে এটিই ইসলামী আন্দোলনের জয়ের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আসন হতে পারে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রুহুল আমিন দুলাল, জামায়াতের প্রার্থী আবদুল জলিল শরীফ। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী মাশরেকুল আলম, এনসিপির শামিম হামিদী এবং জাসদ মনোনীত প্রার্থী করিম সিকদার।

বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দলটি এবার ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে রয়েছে, যা দলীয় প্রার্থীর অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। অপর দিকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রুস্তুম আলী ফরাজী চারবার সংসদ সদস্য থাকায় এলাকায় তাঁর জনভিত্তি আছে।

আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু না হলেও সব প্রার্থীই নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে নানাভাবে অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আছে।

রুস্তুম আলী ফরাজী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির লোকজন আমার সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকসভার নামে নির্বাচনী সভা করা হচ্ছে।’ তিনি এসব বিষয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমিন বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।