‘ম্যালা আশা নিয়া ব্যাটাক চাকরিত পাটাচিনো। ব্যাটায় ট্যাকা পাঠাবে, হামারঘরে অভাব দূর হবি, সুকোত থাকমো। সুক হামার কপালোত সইলো না। সুকের আশাত বুকের ধন হারানো।’ আজ শনিবার দুপুরে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা কারখানায় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ নিহত গাইবান্ধার পশ্চিম কুপতলা গ্রামের রানা মিয়ার (২৩) বাবা দিনমজুর হারুন-অর-রশিদ।
রানা মিয়ার মা মনোয়ারা বেগম (৫৫) আহাজারি করছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘হামরা চাকরি চাই নে বাবা। তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দাও।’
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম কুপতলা গ্রাম। সরেজমিন দেখা যায়, রানা মিয়ার লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই বাবা-মা ও স্বজনেরা আহাজারি করছেন। তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে গ্রামের মানুষ বাড়িতে ভিড় করেছেন। আশপাশের লোকজন নিহত রানার মা–বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
চাকরির পরীক্ষায় যাওয়ার কথা ছিল
পারিবারিক সূত্র জানায়, রানা মিয়া ২০২১ সালে পশ্চিম কুপতলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর কোনো কাজ না পেয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় শ্রমিকের চাকরি নেন।
রানা মিয়ার বড় ভাই মোনারুল ইসলাম চট্টগ্রামের অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। চট্টগ্রাম থেকে ছোট ভাইয়ের লাশের সঙ্গে বাড়িতে আসেন মোনারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রানা গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। ২১ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা হবে, এ জন্য সে খুদে বার্তা পেয়েছে বলে আমাকে মৃত্যুর দুই দিন আগে জানায়। লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আজ রানার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু সে আসল লাশ হয়ে।’ তিনি কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
‘ব্যাটার ক্ষতি হামরা কেমন করি পোসামো’
চট্টগ্রামের একই ঘটনায় নিহত হয়েছেন গাইবান্ধার খোকন মিয়া (২৩)। তাঁর বাড়ি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কিশামত হলদিয়া গ্রামে। খোকনের বাবা বর্গাচাষি মো. রানা মিয়া (৫৮)।
রানা মিয়া বলেন, ‘মানসের দুই বিগে জমি আদি (বর্গা) করি। যেকনা ধান পাই, তাক দিয়া খাওয়াই চলে না। সোংসারোত ম্যালা অবাব। ব্যাটার ট্যাকা দিয়া সোংসারের অবাব মিটামো। অবাব মিটানো দূরের কতা, হামার ব্যাটায় আর নাই। ব্যাটার ক্ষতি হামরা কেমন করি পোসামো।’
পারিবারিক সূত্র জানায়, কিশামত হলদিয়া গ্রামের বর্গাচাষি রানা মিয়ার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সবার ছোট খোকন। খোকনের স্ত্রী দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় ছয় মাস আগে খোকন চট্টগ্রামে জাহাজ কোম্পানির চাকরিতে যান।
আজ সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে খোকন মিয়ার লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বেলা ১১টায় কিশামত হলদিয়া গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। লাশ পৌঁছানোর পর মা–বাবা ও স্বজনেরা আহাজারি করেন।
গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ ৯ জন নিহত হন।