বিদ্যালয়ের শৌচাগারে পাঁচ ঘণ্টা হাত-পা-মুখ বাঁধা, গোঙানি শুনে তালা ভেঙে ছাত্রীকে উদ্ধার
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় একটি বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সেখানকার শৌচাগার থেকে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাকে উদ্ধার করেন নির্মাণশ্রমিকেরা। বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
পুলিশ ও ওই ছাত্রীর ভাষ্য, বিদ্যালয় ছুটির পর একজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ত সে। তবে ঘটনার দিন তার পড়া ছিল না। বেলা দুইটার দিকে ক্লাস শেষে পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে একজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফেরার আগে শৌচাগারের দিকে যায় সে। সেখানে ঢোকার আগে পেছন থেকে কেউ তাকে আঘাত করে বলে জানায় ওই ছাত্রী।
আজ শুক্রবার হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই ছাত্রী জানায়, আঘাত পেয়ে চিৎকার করতে গেলে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে নাকে কোনো একটি পদার্থ স্প্রে করা হয়। এরপর সে আংশিক অচেতন হয়ে পড়ে। তবে কিছুটা জ্ঞান ছিল। এ সময় কেউ একজন ব্লেড দিয়ে তার হাতে আঘাত করছিল বলেও সে অনুভব করে। হামলাকারীদের নেশাগ্রস্ত মনে হয়েছিল বলে জানায় ওই ছাত্রী।
জ্ঞান ফেরার পর সে বুঝতে পারে, তার হাত-পা ও মুখ বাঁধা। কয়েকজনের কথাবার্তার শব্দও শুনতে পায়। হাত বাঁধা অবস্থায় দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে সে। পরে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজে থাকা শ্রমিকেরা শৌচাগারের তালা ভেঙে তাকে উদ্ধার করেন।
ওই ছাত্রী জানায়, হামলাকারীদের কাউকে সে দেখতে পারেনি। তবে তাদের কণ্ঠস্বর শুনলে সে শনাক্ত করতে পারবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, এ বছর বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়েছে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ও আগামী বছরের পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে আগামী সপ্তাহে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) একটি সভা করার কথা রয়েছে। এ জন্য শিক্ষকেরা অভিভাবকদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানাচ্ছেন। এ কারণে টিফিনের পর বেলা দুইটার দিকে বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়।
প্রধান শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে একজন শিক্ষক আলাদাভাবে পড়াচ্ছিলেন। তিনি নিজে বেলা তিনটা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ছিলেন। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ওয়াশব্লকে কারও সাড়া না পেয়ে তালা লাগিয়ে তাঁকে বিষয়টি জানান। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছিলেন, তিনিও বিকেল চারটার দিকে কলাপসিবল গেট লাগিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যান। প্রধান শিক্ষক জানান, ভুক্তভোগী ছাত্রী শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যালয়ে ৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে বারান্দার দুটি ক্যামেরা নষ্ট থাকায় ঘটনার বিষয়ে ফুটেজ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান প্রধান শিক্ষক।
পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে ওই ছাত্রীর বক্তব্য নিয়েছে বলে জানান দিঘলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার সানওয়ার হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সে হামলাকারীদের দেখতে পারেনি। এ কারণে তাদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্যও দিতে পারেনি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এখনো ওই ছাত্রীর পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ করেনি।
ওসি হাওলাদার সানওয়ার হোসেন আরও বলেন, ওই ছাত্রীর বাবা একসময় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন। আর্থিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিরোধ রয়েছে। সেই বিষয়ও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ছাত্রীর হাতে ছোট ছোট ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। কীভাবে ওই ক্ষত হয়েছে, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।