গত দুই দিনের নদীভাঙনে চাঁদপুর ও শঙ্কর হাটি গ্রামের কয়েকটি পরিবার গৃহহীন হয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন চাঁদপুর গ্রামের আবদুস ছালাম (৪৫), হাসমত আলী (৫৫), মো. নুরনবী (৪৮), আমিরুল ইসলাম (৪৭), শুকুর আলী (৪৫), সাহেল আলী (৪৩), আবদুস ছামাদ (৪৮), রওশন আলী (৪০), নুরুল ইসলাম (৫৫) এবং শঙ্কর হাটি গ্রামের সিয়াম হোসেন (৪২), কুরান আলী (৫০) ও আবদুর রহমান (৪০)।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে উপজেলার সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে যমুনা নদীতে ভাঙন চলছে। ভাঙনের কারণে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবন গতকাল সকালে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তখন বিদ্যালয়টির অবশিষ্ট ভবনটি নদীতে ঝুলছিল। গতকাল রাতে সেই ভবনও নদীগর্ভে চলে যায়। যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত এক সপ্তাহে ওই ইউনিয়নের সদিয়া, চাঁদপুর, শঙ্কর হাটি, মাইজ গ্রামের অনেক জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। ইতিমধ্যে নদীভাঙনে গৃহহীন হয়েছে অন্তত ৫০টি পরিবার।

সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় দেখা গেছে, নদীতীরের বাসিন্দারা তাঁদের বসতবাড়ির আসবাব নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। চাঁদপুর গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের হুমকিতে আছে সদিয়া দেওয়ান শঙ্কর হাটি উচ্চবিদ্যালয়, সদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

আমরা নদীভাঙনে শেষ হয়ে গেলাম। কেউ আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল না। আমরা কী এ দেশের নাগরিক না। আমরা কী ভোট দিই না?
নদীভাঙনে বসতবাড়ি হারানো চাঁদপুর গ্রামের হাসমত আলী

যমুনায় বিলীন হওয়া চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল সকালে আমাদের চোখের সামনেই বিদ্যালয়ের একটি পাকা ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। আর রাতের অন্ধকারে আরেকটি ভবন নদীতে চলে গেছে। এ অবস্থায় আমরা কী করব, ভেবে পাচ্ছি না। এলাকার প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর পড়ালেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সামনে পরীক্ষা থাকায় আমরা মহাবিপদে আছি।’ তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টির পাঠদান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পাশের মাইজ গ্রামের একটি জায়গায় পাঠদান কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা চলছে।

চৌহালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন আগেও নদী থেকে বিদ্যালয়ের ভবনটি ২০-২৫ ফুট দূরে ছিল। তখন যমুনার পানিও কমে গিয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, এ বছর আর পানি বাড়বে না। তারপরও তাঁরা নদীতীরে বাঁশের খুঁটি, গাছের ডাল, মাটি ফেলে বিদ্যালয়টি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।

জাহাঙ্গীর ফিরোজ আরও বলেন, গতকাল সকালে বিদ্যালয় ভবনের নিচের অংশ ধসে ভাঙন শুরু হয়। কিছুক্ষণ পরই ভবনটি নদীতে বিলীন হয়। রাতে বিদ্যালয়টির বাকি সব অংশ নদীতে চলে গেছে। তাঁরা সার্বিক বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।

সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত দুই দিনের নদীভাঙনে চাঁদপুর ও শঙ্কর হাটি গ্রামের কয়েকটি পরিবার গৃহহীন হয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন চাঁদপুর গ্রামের আবদুস ছালাম (৪৫), হাসমত আলী (৫৫), মো. নুরনবী (৪৮), আমিরুল ইসলাম (৪৭), শুকুর আলী (৪৫), সাহেল আলী (৪৩), আবদুস ছামাদ (৪৮), রওশন আলী (৪০), নুরুল ইসলাম (৫৫) এবং শঙ্কর হাটি গ্রামের সিয়াম হোসেন (৪২), কুরান আলী (৫০) ও আবদুর রহমান (৪০)।

নদীভাঙনে ভিটাবাড়ি হারানো চাঁদপুর গ্রামের হাসমত আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নদীভাঙনে শেষ হয়ে গেলাম। কেউ আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল না। আমরা কী এ দেশের নাগরিক না। আমরা কী ভোট দিই না?’

ইউপির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। এভাবেই ভেঙে ভেঙে বেশ কয়েকটি গ্রাম শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে একটি ছোট প্রকল্প নেওয়া হলেও যথাযথভাবে কাজ শুরু করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত এক সপ্তাহে শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নয়, চারটি গ্রামের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। তাঁরা তাঁদের সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করছেন।

চৌহালীর ইউএনও আফসানা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৭ তারিখে আমরা ভাঙনের বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পাউবোকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা জরুরি তহবিল থেকে যতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেটি করবে বলে জানিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, যমুনার ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষায় দ্রুত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা এ ব্যাপারে পাউবোর কাছে প্রস্তাবনা রেখেছেন।