বিড়ালছানা দেওয়ার কথা বলে শিশুকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টার পর হত্যা, একজনের মৃত্যুদণ্ড
চট্টগ্রামে তিন বছর আগে এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার পর হত্যা এবং লাশ গুমের মামলায় এক সবজি বিক্রেতার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ চট্টগ্রামের বিচারক মো. সাইফুর রহমান এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামির নাম মো. রুবেল (৩৭)। তিনি চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
রায়ের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মাহমুদুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, শিশুটিকে হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লাশ গুম ও ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনায় তাঁকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের পৃথক ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকেলে নগরের পাহাড়তলী এলাকার ১০ বছর বয়সী ওই শিশু নিখোঁজ হয়। শিশুটি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার মা-বাবা দুজনই পোশাক কারখানার শ্রমিক।
শিশুটির সন্ধান না পেয়ে স্থানীয় থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তার পরিবার। এরপরও খোঁজ না মেলায় পরিবার মো. রুবেল নামের এক সবজি বিক্রেতাকে আসামি করে আদালতে মামলা করে। আদালত পাহাড়তলী থানা-পুলিশকে মামলা নিতে নির্দেশ দেন। মামলা হওয়ার পর মো. রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ঘটনার দু-তিন দিন আগে স্কুলের এক বান্ধবী বিড়াল কিনেছে জানিয়ে শিশুটি মায়ের কাছে বিড়ালছানা কিনে দেওয়ার আবদার করে। তখন শিশুটির মা জানায়, তিনি চাকরির বেতন পেলে বিড়ালছানা কিনে দেবেন। তখন শিশুটি মাকে জানায়, রাস্তায় এক সবজি বিক্রেতা বলেছেন, তাঁর এক পরিচিত লোক আছেন। তাঁর কাছ থেকে বিড়ালছানা এনে দিতে পারবেন। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিনও সবজি বিক্রেতা রুবেল বিড়ালছানা এনে দেবে বলে শিশুটির সঙ্গে কথা বলেন। নিখোঁজ হওয়ার দিন ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, রুবেল শিশুটিকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।
মামলাটির ছায়া তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের আট দিন পর ওই বছরের ২৯ মার্চ নগরের পাহাড়তলী সাগরিকা বাই লেন মুরগি ফার্ম আলমতারা পুকুরপাড় এলাকার ডোবা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পিবিআই।
পিবিআইয়ের তৎকালীন পরিদর্শক ইলিয়াস খান ওই সময় জানিয়েছিলেন, ২১ মার্চ বিকেলে আবার রাস্তায় দেখা হলে শিশুটিকে বিড়ালছানা দেবে বলে ভ্যানে করে নিয়ে যান রুবেল। এরপর ফাঁকা একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি চিৎকার করে দরজা খুলে বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিষয়টি পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন রুবেল।
গ্রেপ্তারের পর আসামি রুবেলকে আদালতে হাজির করা হলে সেখানে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। এতে উঠে আসে, নিখোঁজ হওয়ার পর অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে রুবেলও শিশুটিকে খোঁজার ভান করেন। যাতে তাঁকে কেউ সন্দেহ না করেন। ২১ মার্চ রাতে শিশুটির লাশ বস্তায় ভরে আলমতারা পুকুরপাড় এলাকার ডোবায় নিয়ে ফেলে আসেন। তদন্ত শেষে পিবিআই এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটিকে আসামি রুবেল নিয়ে যাচ্ছেন, সিসিটিভি ক্যামেরার সেই ফুটেজ আদালতের নির্দেশে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। সেখানে প্রমাণ পাওয়া যায়, আসামি রুবেলই সেদিন শিশুটিকে বিড়ালছানার কথা বলে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে আদালত রায় দেন।