কুমিল্লার ১১টি আসনে জয় পেলেন কারা, কত ভোট পেলেন
কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮টিতে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বাকি তিন আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি করে আসন পেয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন একটি আসনে। এ ছাড়া জেলার ১১ আসনেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ঘোষিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র একটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। বেশির ভাগ আসনেই বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান ব্যাপক ছিল। দুটি আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীরা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেনি; ফলাফলে তাঁরা তৃতীয় হয়েছেন। তবে একমাত্র কুমিল্লা-১১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ভালো ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ শেষে শুক্রবার ভোরের দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার ১১টি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান স্বাক্ষরিত স্থানীয়ভাবে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়। রেজা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, দু–একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। সার্বিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। প্রার্থীদের কাছ থেকে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা): এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী দাউদকান্দি উপজেলা জামায়াতের আমির মো. মনিরুজ্জামান বাহালুল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৯৪ হাজার ৮৪৫ ভোট পেয়েছেন। ও আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ১৩৯ জন ভোটার। আর না–ভোট দিয়েছেন ৫৫ হাজার ৫৫৫ জন।
কুমিল্লা-২ (হোমনা ও তিতাস): ‘শক্ত’ বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় কুমিল্লা-২ আসনটি বিএনপির প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) মো. সেলিম ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীকে ৭৭ হাজার ৩৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। সেলিম ভূঁইয়ার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মতিন তালা প্রতীকে ৬৩ হাজার ৪৫ ভোট পেয়েছেন। আবদুল মতিন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একসময়ের এপিএস-২ ছিলেন। এরই মধ্যে দল থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আসনটিতে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী নাজিম উদ্দিন মোল্লা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৫৩ হাজার ৩৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬২ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৩২ হাজার ৩০২ জন।
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর): বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের কুমিল্লা উত্তর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ইউসুফ সোহেল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়েছেন। এবার বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত সাত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ষষ্ঠবারের মতো বিজয়ী হয়েছেন কায়কোবাদ। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩০ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৫৮ হাজার ৫৯৯ জন।
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার): এবারে নির্বাচনে দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল এ আসনটি। কারণ এই আসন থেকে লড়েছেন জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। আসনটিতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন হাসনাত। তিনি শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৩ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছে। ঋণখেলাপির অভিযোগে এ আসনে প্রার্থিতা হারান বিএনপি মনোনীত মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। পরে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনের ট্রাক প্রতীকে সমর্থন দেয় বিএনপি। হাসনাতের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৮৫ ভোট। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ২৮৯ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৩৯ হাজার ৩৮১ জন।
কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া): এ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দুই প্রার্থীর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীকে জসীম উদ্দিন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোবারক হোসাইন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৪৭ ভোট। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৭ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৭২ হাজার ৬৪২ জন।
কুমিল্লা–৬: কুমিল্লা আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলা, সিটি করপোরেশন এবং সেনানিবাস এলাকা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৬ আসনটি জেলার ‘সদর’ আসন হিসেবে পরিচিত। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৭০৬ ভোট। তাঁর নিকটকম প্রতিদ্বন্দ্বী মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৫১ ভোট পেয়েছন। এ আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ১৩ হাজার ২৪৯ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৯৮ হাজার ৪৫০ জন।
কুমিল্লা (চান্দিনা)–৭: কুমিল্লায় বিজয়ীদের মধ্যে বড় চমক দেখিয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)। এ আসনের চারবারের সংসদ সদস্য রেদোয়ান আহমেদকে পরাজিত করেছেন তিনি। বিএনপির চান্দিনা উপজেলার সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার হওয়া আতিকুল আলম কলস প্রতীক ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এলডিপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রেদোয়ান আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট। এই আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের সোলেমান খাঁন দেয়ালঘড়ি প্রতীকে ২৬ হাজার ৩১৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।
এ আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৬৪ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৩৯ হাজার ৩৫৮ জন।
কুমিল্লা-৮ (বরুড়া): এ আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের (সুমন)। ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৭৮ ভোট পেয়েছেন তিনি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. শফিকুল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৯১ ভোট। আসনটিতে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯০ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৭০ জন।
কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ): আসনটিতে বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও লাকসাম উপজেলার সভাপতি মো. আবুল কালাম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দীন ছিদ্দীকি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৬১ ভোট পেয়েছেন। এই আসনটিও টার্গেট ছিল জামায়াতের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালো ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন আবুল কালাম। কুমিল্লা-৯ আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪৯ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৫৩৫ জন।
কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-লালমাই): বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৩৩ ভোট পেয়েছেন। কুমিল্লা-১০ আসনটি জামায়াতের টার্গেট ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালো ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন মোবাশ্বের। এই আসনে গণভোট হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৯৬ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৯৫ হাজার ৭৩২ জন।
কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম): দেশজুড়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল হুদা ধানের শীষ প্রতীকে ৭৬ হাজার ৬৩৮ ভোট পেয়েছেন।
এই আসনে গণভোটে হ্যাঁ–ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৩ জন। আর না–ভোট দিয়েছেন ৪৪ হাজার ৯২৬ জন।