কেউ যান কাজের আশ্বাসে, কেউ বিনা খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার ‘টোপে’ পড়েন

কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা। গতকাল বিকেলেছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন তারেকুল ইসলাম (২৩)। একপর্যায়ে দুজন রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। তাঁরা টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে সেতু নির্মাণের কাজ দেওয়ার কথা বলে তারেকুলকে নিয়ে যান। এরপর টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল হয়ে তাঁকে নেওয়া হয় গহিন পাহাড়ে। সেখানে একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয় তাঁকে।

তারেকুলের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারায়। তিনি বলেন, ২ নভেম্বর তাঁকে কাজের কথা বলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে বন্দী। মাঝেমধ্যে রান্না করা খাবার দেওয়া হলেও বেশির ভাগ সময় খেতে দেওয়া হতো লাউ আর ডাল। একই ঘরে তাঁর সঙ্গে বন্দী ছিলেন আরও ৫৫ থেকে ৬০ জন।

অন্যদিকে ফেনীর দাগনভূঞার নুর কামালকে (২১) বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর টাকা পরিশোধ করতে হবে। সেই আশ্বাসে বাড়ি থেকে ২ নভেম্বর রওনা দিয়ে তিনিও শেষ পর্যন্ত বন্দী হন টেকনাফের পাহাড়ে। সেখানে অস্ত্রধারীদের পাহারায় চলত নির্যাতন।

শুধু তারেকুল বা নুর কামাল নন, তাঁদের মতো আরও অনেককে কাজ দেওয়ার কথা বলে কিংবা বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে এনে আটকে রাখা হয়েছিল টেকনাফের রঙ্গীখালীর গহিন পাহাড়ের ওই আস্তানায়। সেখানে তাঁদের নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চলছিল। পরিকল্পনা ছিল, গত বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হবে।

তবে বৃহস্পতিবার বিকেলে মানব পাচারকারীদের ওই আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযান তাঁদের মুক্ত করে। তারেকুলসহ মোট ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চৌধুরী বলেন, তাঁদের মধ্যে একজনকে মানব পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ৫৬ জন ভুক্তভোগী। এর মধ্যে নাম–ঠিকানা যাচাই করে ৩৭ জনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে গতকাল রাতে। বাকিদের টেকনাফ থানায় রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত মামলা হয়নি।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অভিযানের সময় মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।

অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ এ অভিযানে অংশ নেয়।

মালয়েশিয়া যাওয়ার ‘টোপ’

ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার নুর কামাল গতকাল শুক্রবার টেকনাফ থানায় প্রথম আলোকে বলেন, বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একজন তাঁকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করেন। সেখানে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর টাকা পরিশোধ করতে হবে। ভালো সুযোগ মনে করে তিনি বাড়ি থেকে রওনা দেন।
২ নভেম্বর বাড়ি থেকে রওনা হয়ে ৩ নভেম্বর কক্সবাজারে পৌঁছালে একজন তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে টেকনাফের পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকে রাখেন। এরপর শুরু হয় মারধর ও শারীরিক নির্যাতন। অস্ত্র নিয়ে ১০ থেকে ১২ জন সব সময় পাহারায় থাকতেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যায়, এমন কিছু বললেই মারধর করা হতো। একজনকে নির্যাতন করতে দেখলে অন্য বন্দীরা ভয়ে চুপ হয়ে যেতেন।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বাসিন্দা এস এম আসাদুজ্জামান (৫০) বলেন, ঘুরতে এসে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ইয়ামামুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে শিবিরে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। ২৯ অক্টোবর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মুঠোফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে তাঁকে ১০ হাজার টাকায় মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

আসাদুজ্জামান বলেন, পরে পাচারকারীদের সঙ্গে দুই লাখ টাকায় মুক্তির চুক্তি করেন তিনি। তাঁকে ছেড়ে দিতেও রাজি হয়েছিল তারা। এর আগেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।

পাহাড়ের বন্দিশালার পরিস্থিতি বর্ণনা করে আসাদুজ্জামান বলেন, সেখানে তাঁর মতো অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। অস্ত্রধারীরা পাহারা দিতেন। তাঁদের কাছে প্রায় ১৩০টি দা এবং একে-৪৭-এর মতো ভারী অস্ত্রও ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

আসাদুজ্জামান জানান, দুই দিন আগে একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাঁকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। এরপরই তিনি দুই লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি করেন।

গণমাধ্যমকর্মীদের মানব পাচারকারীদের আস্তানার বর্ণনা দিচ্ছেন উদ্ধার হওয়া তারেকুল ইসলাম
ছবি: ভিডিও থেকে

এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ

উখিয়ার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূর আলী নামের এক দালাল তাঁকে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারেন, তাঁকে ও আরেকজনকে এক লাখ টাকায় কিনেছে তারা।

সাইফুল বলেন, পাঁচ দিন ধরে তিনি দেখেছেন, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছে। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হতো। তাঁরাও পালানোর চেষ্টা করে মারধরের শিকার হয়েছেন। পরে তাঁদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

সাইফুলের ভাষ্য, দিনে দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো লাউ আর ডাল।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনাও বেড়েছে। পাহাড়ের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।