মা–বাবার স্মৃতির সেই সিন্দুকও রক্ষা পেল না চোরের হাত থেকে
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে পুরোনো লোহার সিন্দুক ভেঙে টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি হয়েছে। গতকাল রোববার ভোরে উপজেলার রসুলপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
আধুনিক আলমারি, ড্রয়ার কিংবা লকারের ভিড়ে বহু আগেই হারিয়ে গেছে সিন্দুকের ব্যবহার। তবু ঘরের এক কোণে বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল পুরোনো লোহার সেই সিন্দুক। পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজন হলেও সেটি সরাননি। কারণ, এটি শুধু একটি লোহার বাক্স ছিল না; ছিল কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি আর পারিবারিক ইতিহাসের অংশ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর আগে তাঁদের মা–বাবা সিন্দুকে কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর পরও সেই টাকায় কেউ হাত দেননি। টাকার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল মা–বাবার স্মৃতি। কিন্তু রোববার ভোরে চোরের দল শুধু সিন্দুকের তালাই ভাঙেনি, ভেঙে দিয়েছে পরিবারের সেই স্মৃতির আশ্রয়ও।
রসুলপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনিরুল ইসলাম ও তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসানের বাড়িতে জানালার গ্রিল কেটে ঢোকে চোরের দল। পরে ঘরে থাকা পুরোনো সিন্দুক ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পান মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী আঁখি খাতুন। তিনি দেখেন, ঘরের দরজার নিচের অংশ ভাঙা, জানালার গ্রিল কাটা। ঘরে ঢুকে আসবাব, কাপড়চোপড়সহ সবকিছু এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
আঁখি খাতুন বলেন, ‘চোরেরা আমার শাশুড়ির পুরোনো সিন্দুক ভেঙে নগদ টাকা ও এক ভরি চার আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন চুরি করে নিয়ে গেছে। এতে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
তবে পরিবারের সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি আর্থিক নয়, স্মৃতির। শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মা–বাবার স্মৃতি হিসেবে আমরা কেউই সেই টাকায় হাত দিইনি। তাঁরা মৃত্যুর আগে যেভাবে রেখে গিয়েছিলেন, সেভাবেই ছিল। চোর এসে তালা ভেঙে টাকাগুলো নিয়ে গেছে।’
সিন্দুকটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ইতিহাস। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বয়স তখন পাঁচ-সাত বছর হবে। এক বর্ষায় বন্যার সময় বাবা একটি হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে সিন্দুকটি কিনেছিলেন। পরে নৌকায় করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই থেকে এটি আমাদের পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে।’
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মনিরুল ইসলামের মা মৌলুদা খাতুন ২০১৮ সালে মারা যান। এর আগেই মারা যান তাঁর বাবা আলী আশরাফ মণ্ডল। তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখতেই ছেলেরা সিন্দুকটি আগের মতো সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। মনিরুল ইসলামের চার ভাই—মিজানুর রহমান, মাকসুদুল হাসান, মাহমুদুল হাসান ও তিনি নিজে। চুরির ঘটনাটি ঘটেছে মাকসুদুল হাসানের কক্ষে রাখা সিন্দুকে।