সাতক্ষীরায় ঘেরের নোনাপানিতে নষ্ট হচ্ছে খেতের ধানের চারা
৩০-৩৫ বিঘা ঘেরের জন্য নোনাপানি তোলায় পাশের প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে।
কপোতাক্ষ নদের পাড়ে মাটির বেড়িবাঁধ। বাঁধের এক পাশে নদের নোনাপানি, অন্য পাশে বিস্তীর্ণ তেলিখালী বিল। বিলজুড়ে আমন ধানের চারা—কোথাও সবুজ, কোথাও লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। চিংড়িঘেরের পাশের জমিগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ। ঘেরের নোনাপানি চুইয়ে খেতে ঢুকে ধানের চারাগুলো লালচে হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চারা মরে পড়ে আছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার চাকলা গ্রামের নদ–তীরবর্তী তেলিখালী বিলে গত বৃহস্পতিবার সকালে এমন চিত্র দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চিংড়িঘেরে নোনাপানি তোলার জন্য বেড়িবাঁধে পাইপ বসানো হয়েছে। এতে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাশের ফসলের জমিতে নোনাপানি চুইয়ে খেতে ঢুকে ধানের চারা নষ্ট হচ্ছে।
বেড়িবাঁধের নিচে পাইপ বসানোর স্থান দেখিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা শাকিরা বেগম বলেন, ‘বেড়িবাঁধ কাইটে নদীর পানি তোলার পাইপ আরও নিচে দিচ্ছিল। এই নিয়েই গন্ডগোল হইছিল। ঘেরের নোনাপানি চুইয়ে পাশের জমির ধানের চারা লালচে হয়ে মইরে যাচ্ছে। নোনাপানি বন্ধ না করলি চাষাবাদে সুবিধা হবে না।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের নিচে পাইপ ঢোকানোর একটি স্থানে মাটি দেওয়া হয়েছে। মাটি এখনো নরম। বাঁধের নিচ দিয়ে কপোতাক্ষ নদ থেকে পাশের চিংড়িঘেরে পানি নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চাকলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ ঢালী বলেন, গত বছরও বিলে ভালো ধান হয়েছিল। এবার পাশের ঘেরের নোনাপানি ঢুকে অনেক জমির ধানের চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাকলা খেয়াঘাট-সংলগ্ন তেলিখালীর বিলে আসলাম বেড়িবাঁধ কেটে প্রায় দুই ফুট গভীর করে পাইপ বসিয়ে নোনাপানি তুলছেন। তাঁর ৩০-৩৫ বিঘা ঘেরের জন্য নোনাপানি তোলায় পাশের প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ৭ জন কৃষকের ১৩ বিঘা জমির ধানের চারা নোনাপানির কারণে লালচে হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষক নুরমান সরদারের ছয় বিঘা জমির ধানের চারাও নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর খেতের ধানের চারা লাল হয়ে গেছে। এবার আর ধান হবে না। ঘেরমালিকেরা নোনাপানি তুলে মাছ চাষ করবেন, আর তাঁদের জন্য ধান মরবে। ধান না হলে সারা বছর খাবেন কী? এর একটা সমাধান হওয়া দরকার।
চাকলা, শুভদ্রঘাটি, রুয়ার বিল গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় দেড় হাজারের বেশি বিঘা জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর বিপরীতে তিন-চারজন ঘেরমালিক ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করছেন। নদীর চরের ভেতর বেসরকারি সংস্থা উত্তরণের সহযোগিতায় ১৬-১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে যে রাস্তা করা হয়েছিল, সেটির নিচ দিয়েও পাইপ বসিয়ে নোনাপানি তোলা হচ্ছে।
চাকলা উন্নয়ন কমিটির সদস্য মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, বাঁধ তৈরির উদ্দেশ্য ছিল এর ভেতরের জমিতে মিষ্টিপানিতে ধান চাষ করা। কিন্তু কয়েকজন ঘেরমালিক রাস্তা কেটে পাইপ বসিয়ে নোনাপানি তোলায় বিভিন্ন স্থান ভেঙে পড়ছে। চাকলার তেলিখালী বিলে ২৫০ বিঘার বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর বিপরীতে ঘের রয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে। মূল বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে নোনাপানি তোলার কারণে পাশের ধানের জমিতে পানি ঢুকে চারা নষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ঘেরমালিক আসলাম হোসেনের বিরুদ্ধে পাউবোর পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনায় ২৩ আগস্ট এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, ঘেরমালিক আসলাম হোসেনসহ ১০-১২ জন চাকলা গ্রামের তেলিখালী বিল এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে পাইপ বসিয়েছেন। এতে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
ঘেরমালিক আসলাম হোসেনের দাবি, তিনি নতুন করে বেড়িবাঁধ বা রাস্তা কাটেননি। বাঁধের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে আগে থেকে থাকা পাইপের মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে সেটি মেরামত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে ঘের করছি। গত বছরও ঘের ছিল, তখন তো পাশের ধানের ক্ষতি হয়নি। এবার আমি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ছিলাম। ওই সময়ে ঘের দেখাশোনার লোক না থাকায় সেখানে পানি বেড়ে যায়।’
নোনাপানি তোলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে ঘেরমালিকদের বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিন আগে ঘেরমালিক আসলাম লোকজন নিয়ে পাইপ বসানোর কাজ করছিলেন। প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও চাকলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফ বাধা দিলে তাঁদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে হাতাহাতির পর্যায়ে গেলে স্থানীয় লোকজন তাঁদের থামান।
ইউপি সদস্য আব্দুর রউফ বলেন, চাকলা খেয়াঘাট-সংলগ্ন তেলিখালীর বিলে আসলাম বেড়িবাঁধ কেটে প্রায় দুই ফুট গভীর করে পাইপ বসিয়ে নোনাপানি তুলছেন। তাঁর ৩০-৩৫ বিঘা ঘেরের জন্য নোনাপানি তোলায় পাশের প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান চাষ হুমকির মুখে পড়েছে।
জানতে চাইলে সাতক্ষীরা পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এর সত্যতা পেয়েছেন। ঘেরমালিক আসলাম হোসেনের বিরুদ্ধে পাউবোর পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। চাকলা এলাকায় আরও কয়েকজন একইভাবে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত করে নোনাপানি তোলার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে সরেজমিনে জরিপ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।