পদযাত্রা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আবারও মাঠে মজিবর রহমান সরোয়ার

বরিশালে মজিবর রহমান সরোয়ারের নেতৃত্বে বড় জমায়েত নিয়ে দীর্ঘ পদযাত্রা। গত শনিবার নগরের সদর রোডে
ছবি: প্রথম আলো

পদযাত্রা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর বরিশালের রাজনীতিতে আবারও সক্রিয় হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার। গত শনিবার দক্ষিণ জেলা বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। নগরের সদর রোড হয়ে আমতলা মোড় পর্যন্ত বড় জমায়েতের এ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা। হঠাৎ বরিশালের রাজনীতিতে তাঁর এমন সক্রিয় হয়ে ওঠাকে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন অনেক নেতা-কর্মী।

তবে মজিবর রহমান সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি বরিশালের মাটি, মানুষের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। বিএনপির দুঃসময়ে দলকে ছেড়ে যাইনি। জেল খেটেছি, নির্যাতন সহ্য করেছি। ফলে বরিশালের সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আমার আবেগের সম্পর্ক। এটাকে ছিন্ন করা অসম্ভব।’

জেলা ও নগর বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, মজিবর রহমান বরিশালের রাজনীতিতে সক্রিয় হোন—দলের বর্তমান মহানগর কমিটির নেতারা এটা চাইছেন না। নতুন কমিটির নেতাদের মধ্যে অনেকে বিএনপির টিকিটে মেয়র ও সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের আগ্রহে স্থানীয় রাজনীতি ও আন্দোলনে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান।

ফলে এখন স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার জন্য মজিবর রহমানের জন্য উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপি বলে মনে করেন দলটির স্থানীয় চারজন নেতা। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, এই সাংগঠনিক ইউনিটে রয়েছে বরিশাল সদর আসন ও সিটি করপোরেশন। মজিবর রহমান সিটি করপোরেশন ও সদর আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী।

বরিশাল মহানগর বিএনপির সূত্র জানায়, বরিশাল মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি বাতিল করে ২০২১ সালের নভেম্বরে নতুন আহ্বায়ক কমিটি করে কেন্দ্র। এতে সভাপতির পদ থেকে বাদ পড়েন মজিবর রহমান। এর পর থেকে একরকম বরিশালের রাজনীতি থেকে নির্বাসিত ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে দক্ষিণ ও উত্তর জেলা বিএনপির রাজনীতিও চলে যায় বিরোধীদের হাতে। ফলে প্রায় দেড় বছর বরিশালের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন মজিবর রহমান। বিএনপির কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাঁকে নিজ জেলা ও মহানগরে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছিল না।

বরিশালে মজিবর রহমান সরোয়ারের নেতৃত্বে বড় জমায়েত নিয়ে দীর্ঘ পদযাত্রা। গত শনিবার নগরের দক্ষিণ আলেকান্দা এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

মজিবর রহমান সরোয়ার প্রায় ২০ বছর বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র, বরিশাল সদর আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদের হুইপ ছিলেন তিনি। তাঁর হাতেই ছিল বরিশালের দুটি জেলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ।

মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, সামনে বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ কারণে নিজ এলাকার আন্দোলনে সক্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন মজিবর রহমান। মহানগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব তাঁকে ও তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীদের জায়গা দিতে চাননি। এমন পরিস্থিতিতে ১৯ জানুয়ারি নগরের কাউনিয়া এলাকায় একটি বিদ্যালয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দোয়া অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করেন মজিবর রহমান। সেখানে মহানগর ও জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির নেতাদের তিনি নিজে মুঠোফোনে কল করে দাওয়াত দেন। তবে তাঁরা কেউ আসেননি। এরপর ২১ জানুয়ারি থেকে তিন দিন বরিশাল নগরের বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত ও ভবঘুরেদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করেন। 

নগর বিএনপি সূত্র জানায়, গত শনিবার অনেকটা আকস্মিকভাবে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন মজিবর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খানসহ অন্য নেতারা। তবে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান, সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির এতে অংশ নেননি। তাঁরা ছিলেন বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির পৃথক আরেকটি কর্মসূচিতে। ওই কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবদিন।

পদযাত্রা কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে মজিবর রহমানের প্রত্যাবর্তন হতে যাচ্ছে বলে মনে করেন কি না, জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, সব জেলায়ই তো কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকেও সেভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুজ্জামান খান বলেন, ‘ওই পদযাত্রায় উপস্থিত হওয়ার পরও আমার নামটি মঞ্চ থেকে উচ্চারণ করা হয়নি। তাহলে আমি সেখানে থাকি কীভাবে?’  
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খানের দাবি, ‘আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর নগর বিএনপির রাজনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা মূল্যায়িত হয়েছে। সবগুলো কর্মসূচি সফলতার সঙ্গে আমরা পালন করেছি। এমনকি বিভাগীয় গণসমাবেশে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় জমায়েত হয়েছে। আমরা তো সবাইকে নিয়েই রাজনীতি করি। এটা আমাদের দুর্বলতা নয়, উদারতা।’

তবে মজিবর রহমান সরোয়ারপন্থী নেতা নগর বিএনপির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক বলেন, গত দেড় বছরের সব কর্মসূচি পালন করা হয়েছে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার সম্মিলিতভাবে। কিন্তু মজিবর রহমান সরোয়ার দায়িত্বে থাকার সময় মহানগর বিএনপি এককভাবেই সব কর্মসূচি করার সামর্থ্য রাখত। এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের পর কেন্দ্র তাঁর ব্যাপারে মনোভাব পরিবর্তন করেছে।