বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রহিমার শিশুসন্তান নূর মাহিমের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নূর মাহিম তার নিজের কপালের বাঁ পাশ ছুঁয়ে এই প্রতিবেদককে দেখিয়ে বলে, ‘আমার আম্মা কপালে এইখানে যদি ব্যথা না পাইতো, তাইলে মরতো না। আম্মা যে গাড়ি দিয়া অফিসে যায়, ওই গাড়িরে একটা ট্রেইন আইসা ভাইঙ্গা দিছে। পরে বাড়ি লাইগা আমার আম্মা কপালে ব্যথা পাইছে। এরপর মইরা গেছে। আম্মা প্রত্যেকদিন যে কাপড় পরতো, সেগুলা দেখলে এখন আমার খালি কান্দা আসে।’

রহিমার স্বামী জুলহাস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রহিমা খাতুনকে তাঁরা প্রিয়া নামে ডাকতেন। প্রতিদিন সকাল সাতটায় কর্মস্থলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হতেন তিনি। সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে হতো। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকত তাঁদের সন্তান নূর মাহিম। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে সারা দিনের জন্য বিদায় নিতেন মা। কারখানায় কাজের সময় ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই মাঝেমধ্যে লুকিয়ে অন্য কারও ফোন থেকে সন্তানের খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নিতেন রহিমা। সন্ধ্যা হয়ে এলে মায়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকত মাহিম।

জুলহাস উদ্দিন আরও বলেন, তাঁদের পুরো পরিবার কৃষিনির্ভর। এর মধ্যে রহিমা বছরখানেক আগে জামান ফ্যাশনওয়্যার কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন। নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ও সাংসারিক খরচে ভূমিকা রাখতেই তাঁর চাকরিতে যোগ দেওয়া। জুলহাস বলেন, তিনি নিজেও কুমিল্লায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুজনের যৌথ আয়ে সংসার মোটামুটি ভালোই চলত। তিনি বলেন, সন্তানকে কীভাবে মানুষ করা যায়, তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েই ব্যস্ত থাকত রহিমা। গতকাল দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কুমিল্লা থেকে বিকেল নাগাদ বাড়ি আসেন তিনি।
রহিমার জা নাসিমা খাতুন বলেন, ভালোবেসে জুলহাস বিয়ে করেছিলেন রহিমাকে। বেশ ভালোই চলছিল তাঁদের সংসার। একমাত্র সন্তান নিয়ে সুখের সংসার তাঁদের। কিন্তু আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

রহিমার শ্বশুর নুরুল ইসলাম বলেন, ট্রেন-বাস সংঘর্ষে রহিমা মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে মৃত অবস্থায় তাঁকে বাড়িতে আনা হয়। ক্ষতবিক্ষত নিস্তেজ অবস্থায় মাকে দেখে মাহিম কান্না শুরু করে। রহিমা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পর মাহিম তার দাদি শামছুন্নাহার ও চাচি নাসিমা খাতুনের কাছে থাকে। তবে সারাক্ষণ মায়ের কথা বলে। তিনি বলেন, আজ সকাল থেকে বেলা ১১টার মধ্যে বেশ কয়েকবার মাহিম তার মায়ের কবরের কাছে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন