সুমনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলা শহরের দিনমজুর মৃত নূর আলী খন্দকারের ছেলে সরোয়ার খন্দকার। তাঁরা চার ভাই ও তিন বোন। অর্থের অভাবে পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি। সরোয়ার ছোটবেলা থেকেই মোটরগাড়ির কাজে চলে যান। এরপর বিয়ে করে গ্রামেই থাকতেন। এরই মধ্যে মা–বাবা দুজনই মারা যান। তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হয় অনেক টাকার। এই টাকা জোগাড় করতে না পেরে যখন মরতে বসেন, তখন বাবার রেখে যাওয়া এক শতক জমি বিক্রি করে দেন। চিকিৎসা শেষে থাকার কোনো জায়গা না থাকায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কালীগঞ্জ শহরের আড়পাড়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে ওঠেন। সেখান থেকে গ্রামে গ্রামে চুড়ি-মালা ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন। অনেক পরিশ্রম করে ২০১৬ সালে কাশিপুর মাঠপাড়ায় একতলা বাড়িসহ চার শতক জমি কেনেন। পরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানেই বসবাস করছিলেন সরোয়ার। সংসারটা তিনি একাই চালিয়ে নিয়ে আসছিলেন। এরই মধ্যে বড় ছেলে সুমন খন্দকার ট্রেনে তিলের খাজা বিক্রির কাজ ধরেন। মেজ ছেলে বাড়িতেই থাকতেন।

এ অবস্থায় সংসারে আরও একটু সচ্ছলতা আনতে সুমনকে সৌদি আরবে পাঠানোর পরিকল্পনা করেন সরোয়ার। গ্রামের হবিবর রহমান তাঁর ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠানোর কথা বলেন। হবিবর সৌদিতে ভালো কাজ নিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ জন্য তাঁর কাছ থেকে চার লাখ টাকা দাবি করেন। পরে ভালো কাজের কথা বলে আরও দুই লাখ টাকা নেন। শেষ পর্যন্ত সৌদিতে কাজ তো জুটলই না, বরং ছেলেকে সেখানে আটকে রেখে নির্যাতনের সময় আরও এক লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন সরোয়ার। মোট সাত লাখ টাকা খরচ করেছেন তিনি, যার মধ্যে ছয় লাখ টাকা বাড়িসহ জমি বিক্রির এবং এক লাখ টাকা এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া। সব হারিয়ে এখন পুরো পরিবার নিঃস্ব।

সুমন খন্দকার বলেন, ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল তাঁরা সৌদি বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল চক্রের সদস্যরা এসে তাঁদের নিয়ে যায়। প্রথমে একটি ঘরে তাঁদের আটকে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না। এক মাস পর তাঁদের নেওয়া হয় মক্কার মরুভূমি এলাকায়। সেখানে উট রাখার ঘরে আটকে রেখে টাকার জন্য নির্যাতন করা হয়। এভাবে সাড়ে চার মাস আটকে রাখা হয়। এরই মধ্যে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে তিনি বাড়ি থেকে আরও এক লাখ টাকা নিয়ে দালাল চক্রকে দেন। শেষ পর্যন্ত গত ১৬ সেপ্টেম্বর পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন। বাড়ি ফিরে দেখেন মা–বাবা ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা দুজনই আবার চুড়ি–মালা ফেরি করে বিক্রি করছেন। জীবন বাঁচাতে সুমন নিজেও শুরু করলেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর কাজ।

সরোয়ার খন্দকার বলেন, তিনি পাচারকারীর হাতে দেওয়া টাকার ফেরতের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মামলাও করেছেন, কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। পুলিশ এক মাসে আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। মাঝেমধ্যে তাঁকে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। মানব পাচারকারীর কারণে আজ তিনি পথে বসেছেন। তিনি এর উপযুক্ত বিচার চান। পাশাপাশি টাকা ফেরত পেলে তিনি বেঁচে যেতে পারেন। অন্যথায় পরিবার–পরিজন নিয়ে পথে পথে ঘুরে বাকি জীবন কাটাতে হবে।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুর রহিম মোল্লা বলেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান চালালেও তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দ্রুতই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন।