৫০ টাকার বিনিময়ে নির্বাচনী মিছিলে যান তাঁরা
শনিবার দুপুর। রাজশাহী নগরের রামচন্দ্রপুর নদীর ধারের বস্তির মাঠজুড়ে উড়ছে ভেজা কাপড়। বস্তিবাসী কাপড় ধুয়ে এই মাঠেই শুকাতে দেন। এই মাঠেই মা-মেয়ে রোদে বসে মাথায় চিরুনি করছেন। চিরুনি করতে করতে মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘কাল মিছিলে গ্যালা ট্যাকা কই?’ মা বলছেন, ‘আইজ গেলে নাকি একসঙ্গে দিবেহেনি।’
নির্বাচনের সময় এই বস্তির বাসিন্দা নারীদের মৌসুমি মিছিলে যাওয়ার ডাক পড়ে। তাঁরা মিছিলে গিয়ে পরিবারের জন্য একটু বাড়তি আয় করেন। এবার মিছিলের ভাড়া কমেছে। তারপরও তাঁরা যাওয়া বন্ধ করেননি। এক দিন গেলে ৫০ টাকা দেওয়ার কথা। তবে মিছিলে লোক বেশি হয়ে গেলে বরাদ্দ কমিয়ে ৪০ টাকা করে দিচ্ছেন। সাত দিন ধরে তাঁরা নিয়মিত মিছিলে যাচ্ছেন। বস্তির নারীদের সঙ্গে গল্পে গল্পে এই খবর জানা গেল। ওই মহল্লায় এটা নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে কোনো রাখঢাকও নেই। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে যেকোনো দল টাকা দিলেই মিছিলে যান। এবার বিএনপির মিছিলে যাওয়ার জন্য বস্তির নারীদের বেশি ডাকা হচ্ছে। তবে বরাদ্দ কম।
বস্তির এই মাঠে বসে প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক নারীর সঙ্গে কথা হয়। বললেন, তাঁর জন্ম হয়েছিল রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। ছোট বয়সে মা মারা গেছেন। শহরের এক লোক প্রতিপালন করেই এই বস্তিতে বিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী রিকশা চালাতেন। তিন বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। জামাই নেশা করে বলে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর মেয়ে এখন ওষুধ কারখানায় কাজ করে। তাঁর সঙ্গেই থাকেন এই বৃদ্ধা। বৃদ্ধার ছেলে রিকশা চালান। তাঁরই চারটা ছেলে। নিজেরই চলে না। তাই বাধ্য হয়ে মিছিলে ডাক পেলেই যান তিনি।
ওই মাঠে ঘাসের ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন প্রায় ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তাঁর একটি হাত অচল। যতক্ষণ বসে ছিলেন, বাঁ হাত দিয়ে অচল ডান হাতটাকে ম্যাসাজ করছিলেন। বললেন, তাঁর দুই ছেলে। একজন বাসের চালকের সহকারী আর একজন রিকশা চালান। ছেলেদের সব দিন কাজ হয় না। সংসার ভালো চলে না। মিছিলে তিনি দুই দিন গিয়েছেন। পিছে পিছে হলেও থাকেন। এবার ৫০ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর স্ত্রীও সঙ্গে যান। দুজন গেলে ১০০ টাকা হয়। তবে এবার দিনের দিন সব টাকা দিচ্ছে না। সব সময় এক দিন হাতে রেখে টাকা দিচ্ছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় তাঁদের মিছিল থেকে বেশি আয় হয়। কাউন্সিলরসহ প্রার্থী বেশি থাকে।
মিছিল তো ভাড়ায় করেন, ভোট দেবেন কিসে জানতে চাইলে লোকটি বললেন, ‘আমি তো ধানের শীষেই দিতে চাই। কিন্তু কাল বিকেলে রেলগেটের ওদিকে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনি সবাই শুধু পাল্লা পাল্লা বুইলছে। আমাকে বুইলছে, পাল্লায় ভোট দিতে হবে। কোনো জবাব দিইনি। শুধু শুনি গেনু।’
প্রায় ৭০ বছর বয়সী আরেকজন নারী কথা শোনার জন্য পাশে এসে বসলেন। ৪০ দিন হচ্ছে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। রিকশা চালাতেন। এখন দুই ছেলের কাছে থাকেন। নিজের থেকেই বললেন, তাঁর এক ছেলে ছোট মুদিখানার দোকান চালায়। আরেকটা রং-বার্নিশের কাজ করে। সংসার ভালো চলে না। তিনি নিজে চলতে পারেন না। অনেক ওষুধের খরচ। দুই ছেলের বউ মিছিলে যায়।
আরেকজন কম বয়সী নারী বললেন, তাঁর স্বামী রিকশা চালান। তিনি সাত দিন মিছিলে গেছেন। দিন ৫০ টাকা হিসাবে তিন দিনের টাকা পেয়েছেন। এখনো সব টাকা হাতে আসেনি। এক দিন দিচ্ছে, এক দিন দিচ্ছে না।
আরেকজনের স্বামী অনেক দিন আগে মারা গেছেন। ছেলে আছে। রিকশা চালায়। তিনি সাত দিন মিছিলে গেছেন, ৫০ টাকা করে পেয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা এই এলাকার লোকজনকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি জানান, বিশেষ করে কাজ নেই, বাড়িতে বসে থাকেন, এমন নারী ও পুরুষেরাই একবেলা করে মিছিলে যান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা প্রথম আলোকে বললেন, এবার মিছিলের বরাদ্দ কম। টাকাই কম। তাই ৫০ টাকা করে দৈনিক দেওয়া হয়। তবে একসঙ্গে দেওয়া হয় না, এক দিন হাতে রেখে আগের দিনেরটা দেওয়া হয়। গত নির্বাচনে মিছিলে গেলেই মানুষ ১০০ টাকা করে পেয়েছে। তবে তিনি বললেন, পেটের দায়ে এই এলাকার মানুষ মিছিলে যায়, কিন্তু তাদের দিকে কেউ নজর রাখে না।