যমুনা অয়েল কোম্পানির আলোচিত তিন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মিটার অপারেটর মো. আবুল হোসেন, কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ এয়াকুব ও গেজার (তেল পরিমাপকারী) জয়নাল আবেদীন ওরফে টুটুল। গতকাল বুধবার এ সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
কোম্পানি সূত্র জানায়, মো. আবুল হোসেন যমুনার লেবার ইউনিয়নের সভাপতি। সাত মাস আগে একটি ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে আছেন। দুই মাস আগে গ্রেপ্তার হন মো. এয়াকুব। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত জয়নাল আবেদীন।
যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমীর মাসুদ তিন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যমুনার এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, থানা ভাঙচুর ও লুটপাটসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা মামলায় আবুল হোসেন কারাগারে আছেন। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন এয়াকুব। বিধি অনুযায়ী তাঁদের বরখাস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় জয়নাল আবেদীনকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
জয়নাল আবেদীন ও মোহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলোতে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ অক্টোবর ‘তেল চুরি’, ব্রাজিল বাড়ি ও তাঁদের আয়েশি জীবন’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়। তার আগে ৮ অক্টোবর তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
‘আয়েশি’ জীবনের গল্প
তেল কোম্পানিগুলো ডিপোর মাধ্যমে সারা দেশে ডিলারদের কাছে জ্বালানি সরবরাহ করে। দেশে এমন ডিপো রয়েছে ৪৭টি, যার মধ্যে যমুনার ১৫টি। জয়নাল আবেদীনের বাবা মো. রফিক ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোর দারোয়ান। বাবার মৃত্যুর পর ক্যানটিন কর্মচারী হিসেবে চাকরি পান জয়নাল। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে স্থায়ী হন। অল্প সময়ের মধ্যেই গেজার পদে ওঠেন।
২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় তিনি আলোচনায় আসেন। ফতুল্লায় তাঁর ছয়তলা বাড়ির পুরোটা রাঙানো হয় ব্রাজিলের পতাকার রঙে। নাম দেওয়া হয় ‘ব্রাজিল বাড়ি’। বিশ্বকাপ চলাকালে বাড়িটি দেখতে যান ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভেরিয়া জুনিয়র। আলোচনায় আসেন জয়নাল।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগ এবং কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, জয়নাল ও তাঁর পরিবারের নামে কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। ফতুল্লায় আছে আলোচিত ব্রাজিল বাড়ি। অভিযোগ আছে, তেল চুরির মাধ্যমে অবৈধ আয়ে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি জ্বালানি পরিবহনের জন্য তাঁর দুটি জাহাজ ও দুটি ট্যাংক-লরি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজে চলাচল করতেন প্রিমিও গাড়িতে।
অন্যদিকে মোহাম্মদ এয়াকুব ১৯৯৭ সালে স্থায়ী চাকরি পান। ২০০৯ সালে লেবার ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। এক বছর পর সাধারণ সম্পাদক। গত দেড় দশক ইউনিয়নটি ছিল শ্রমিক লীগের নিয়ন্ত্রণে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটি শ্রমিক দলে রূপ নেয়—এয়াকুবের নেতৃত্বেই। সর্বশেষ তাঁর বেতন ছিল ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। তবে আয়ের তুলনায় তাঁর জীবনযাপন ছিল বিলাসী—এমন অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা খুলশীতে চার হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে থাকতেন। নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগ। চলাফেরা করতেন নোয়াহ মাইক্রোবাসে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানেও তাঁর অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য মিলেছে।