যোগাযোগব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র—কিছুই নেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপটিতে
কক্সবাজারের পেকুয়ার করিয়ারদিয়া দ্বীপে সাড়ে তিন হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে বসবাস করছে। নেই নিরাপদ যোগাযোগ, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা। একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্রটিও ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা, কমছে ধানচাষ সহ ফসলের আবাদ।
এক পাশে সাগর, অন্য পাশে মাতামুহুরী নদী। মাঝখানে ছোট্ট একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড। নাম করিয়ারদিয়া। সমুদ্রের গর্জন আর নদীর জোয়ার-ভাটার মধ্যে এই গ্রামে বসতি সাড়ে তিন হাজার মানুষের। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের এই দ্বীপের চারপাশে পানি। নেই সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সেতু আর নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস।
করিয়ারদিয়া দ্বীপ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান। রাতের আঁধারে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোকচ্ছটা দেখা যায় দ্বীপ থেকে। কিন্তু সেই আধুনিক উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি করিয়ারদিয়ার মানুষের জীবনে। দ্বীপে যাওয়ার জন্য এখনো কোনো সেতু নির্মাণ করা হয়নি। দ্বীপের প্রধান সড়কটি মাত্র আট ফুটের। এর মধ্যে কিছু অংশে ইট বিছানো, কিছু অংশে ইট উঠে গেছে আবার কিছু অংশ কাঁচা। পুরো দ্বীপে যানবাহন বলতে মাত্র তিনটি ইজিবাইক। বেহাল সড়কের কারণে এই ইজিবাইকগুলো সব সড়কে যেতে পারে না। জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে নৌকা আর পায়ে হাঁটার ওপর নির্ভর করতে হয়।
পুরো দ্বীপের মানুষের জন্য এখনো একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি নির্মাণ হয়। লবণাক্ততার প্রভাবে ভবনটির বেশ কিছু অংশ খসে পড়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।
এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মানুষের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। স্বাস্থ্যসেবা পেতে চরম ভোগান্তি পেতে হয়। কেউ অসুস্থ হলে ডিঙিতে করে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়। রাতের বেলা বা খারাপ আবহাওয়ায় রোগী পারাপার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি। হাসপাতালে যেতে না পেরে পানিবাহিত নানা রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহান প্রসূতিরা। অনেক প্রসূতি বাচ্চা জন্মদানের সময় এগিয়ে এলে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন।
২৩ জানুয়ারি রাতে স্থানীয় বাসিন্দা প্রবাসী মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী শাহীনা আকতারের (৩২) প্রসব বেদনা ওঠে। নৌকা না পাওয়ায় এবং ভাঙা সড়ক দিয়ে প্রসূতিকে নিতে না পারায় রাতে তাঁকে মূল ভূখণ্ডের কোনো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে ডিঙিতে নদী পার হয়ে পেকুয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। তবে বাঁচানো যায়নি নবজাতকটিকে। মোহাম্মদ সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘করিয়ারদিয়া দ্বীপে স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় খুব কষ্ট পেতে হয় আমাদের। এক দিন পর হাসপাতালে নেওয়ার কারণে আমার স্ত্রীর নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে নবজাতক মারা যায়। এভাবে আমরা আমাদের সন্তান বা স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলছি।’
দ্বীপে বিশুদ্ধ পানির সংকটও প্রকট। শুষ্ক মৌসুমে বেশির ভাগ নলকূপে পানি ওঠে না। যেসব নলকূপে পানি পাওয়া যায়, তা–ও লবণাক্ত। অনেকে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন। কেউ কেউ দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেন এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয় গুদামপাড়ার বাসিন্দা সৈয়দা খাতুন (৪৫) বলেন, নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। দুর্যোগের সময় সেই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বেহাল আশ্রয়কেন্দ্র
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে করিয়ারদিয়ার মানুষকে। সেই দুর্যোগে এই দ্বীপেই প্রাণ হারিয়েছিল দুই শতাধিক মানুষ। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বদলায়নি নিরাপত্তার চিত্র।
পুরো দ্বীপের মানুষের জন্য এখনো একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি নির্মাণ হয়। লবণাক্ততার প্রভাবে ভবনটির বেশ কিছু অংশ খসে পড়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দেয়াল, বিম ও বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের কিছু অংশে পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি ভেঙে গেছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে পাঠ নিচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আশঙ্কা, বড় ধরনের ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড় হলে ভবনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা জানান, বর্ষা মৌসুম কিংবা নিম্নচাপের খবর এলেই আতঙ্ক বাড়ে। কারণ, এই একটি ভবনেই আশ্রয় নিতে হয় পুরো দ্বীপের মানুষকে। দুর্যোগের সময় নারী, শিশু, বৃদ্ধ মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ গাদাগাদি করে অবস্থান নেন। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত কক্ষও নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা গবাদিপশু নিয়ে। দ্বিতীয় তলায় ওঠানোর জন্য কোনো র্যাম্প না থাকায় গরু-ছাগল নিচতলায় বেঁধে রাখতে হয়। এতে জলোচ্ছ্বাসের সময় পশুসম্পদ রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ষাটোর্ধ্ব কালু মিয়া ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় কথা স্মরণ করে বলেন, সেদিন আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে। বেশির ভাগ পরিবার নৌকায় আশ্রয় নিয়েছিল। ঝোড়ো হাওয়ায় নৌকা ডুবে গিয়ে প্রাণ হারায় মানুষ। এরপর একটি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হলেও এখন সেটা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।
পেকুয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ বোস প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনে আর শ্রেণি কার্যক্রম চালবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নিচে একটি শেড তৈরি করে সেখানে ক্লাস করাব। ইতিমধ্যে এই কাজের জন্য সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে কাজ চলছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এমদাদুল হক শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দ্বীপের একটিমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র কাম বিদ্যালয় এত ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি জানতাম না। দ্রুত সময়ের মধ্যে কীভাবে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়, সেটি দেখছি।’
বাড়ছে জোয়ার ও লবণাক্ততা
বর্ষা মৌসুমে করিয়ারদিয়ায় বেড়িবাঁধে ভাঙন বাড়ছে। অল্প বৃষ্টিতেই নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। স্থানীয় মানুষেরা বলছেন, আগের চেয়ে বাড়ছে জোয়ারের উচ্চতাও। জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় লবণাক্ততাও বেড়েছে। এ কারণে অনেক স্থানে কৃষি উৎপাদন কমে গেছে।
একসময় দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেখানে বেড়েছে লবণ চাষ ও মাছের ঘের। কারণ, মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় আগের মতো ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। এতে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় ষাইটপাড়ার কৃষক আবু তাহের (৫৫) বলেন, আগে এই জমিতে ভালো ধান হতো। এখন লবণপানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। অনেকেই ধানের জমিকে শুষ্ক মৌসুমে লবণের মাঠ ও বর্ষায় মাছের ঘের করছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও করিয়ারদিয়ায় সেই ব্যবস্থাও দুর্বল। মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেক সময় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা সবার কাছে দ্রুত পৌঁছায় না। অনেক পরিবার এখনো মাইকিং কিংবা লোকমুখে খবর পেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়। দ্বীপে নেই কোনো ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র বা দুর্যোগ প্রস্তুতিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, দুর্যোগের আগে সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা খুব কম দেখা যায়। ফলে মানুষ অনেক সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িঘর ছাড়তে চায় না।
জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘ এক দশক ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), কক্সবাজারের সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। করিয়ারদিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদও দেন তিনি।