রাউজানে দুই মাস বন্ধ থাকার পর আবার খুনোখুনি শুরু

গুলিতে নিহত যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের রাউজানে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর আবারও হামলা ও খুনোখুনির ঘটনা শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে খুন করা হয় উপজেলা যুবদলের এক নেতাকে। ২০২৪ বছরের ২৯ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত উপজেলাটিতে অন্তত ১৯ জন খুন হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে।

গতকাল নিহত যুবদল নেতার নাম মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার (৪৮)। তিনি রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্য এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর বাড়ি ওই ইউনিয়নের সিকদারপাড়া গ্রামে। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গিয়াস উদ্দিন কাদের অভিযোগ করেছেন, দলের প্রতিপক্ষের লোকজন জানে আলম সিকদারকে হত্যা করেছেন।

পুলিশ জানায়, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।

জানে আলম সিকদার নিহত হওয়ার আগে রাউজানে সর্বশেষ খুনের ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৫ অক্টোবর। ওই দিন মুহাম্মদ আলমগীর আলম (৪৫) নামের যুবদলের এক কর্মীকে গুলি করে খুন করা হয়। তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকার—এই দুই নেতাকে কেন্দ্র করে রাউজানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিভক্ত। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে দুজনকেই প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাউজানে ১৬ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ১৯ জন খুন হওয়া ছাড়াও শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। হতাহত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী। খুনের ঘটনার দুটি উপজেলার নোয়াপাড়ায়, দুটি হলদিয়ায়, তিনটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে, একটি রাউজান সদরে, দুটি বাগোয়ানে, দুটি উরকিরচরে, দুটি কদলপুরে, একটি চিকদাইরে, একটি পাহাড়তলীতে, দুটি পূর্ব গুজরায় এবং একটি মদুনাঘাট বাজারে সংঘটিত হয়েছে।

জানে আলম আমার খুবই বিশ্বস্ত সহকর্মী। তাঁকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ মাঠ দখলে রাখতে চায়। এভাবে আমার কর্মীদের শূন্য করে তারা রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে না।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত), বিএনপি।

নিহত ১৯ জনের মধ্যে অন্তত ১৩ জন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। গত ১৬ মাসে খুন হওয়া বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন জানে আলম সিকদার, আলমগীর আলম, মুহাম্মদ আবদুল হাকিম, কমর উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম, মানিক আবদুল্লাহ, মুহাম্মদ সেলিম, দিদারুল আলম ও ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের ও মুহাম্মদ হাসান। সর্বশেষ নিহত যুবদল নেতা জানে আলমের বিরুদ্ধে গত বছর দু্বাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির বাড়িতে গুলি ছোড়া ও চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল। এ ঘটনায় করা মামলায় তিনি জেলও খেটেছেন।

গত ২৫ অক্টোবর যুবদলকর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলম নিহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় ও অস্ত্র উদ্ধার শুরু করলে রাউজানে হানাহানি কমে আসে। গত দুই মাস অনেকটাই শান্ত ছিল এলাকা। তবে সম্প্রতি আবারও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। গত ২৮ ডিসেম্বর রাতে কদলপুর ইউনিয়নের লস্কর ওজির দিঘির পাড়ে মুহাম্মদ পারভেজ (৩৫) নামে এক যুবদলকর্মীকে পিটিয়ে আহত করার পর ফাঁকা গুলি করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এরপর গতকাল রাতে জানে আলম সিকদারকে খুন করা হয়।

চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্র–গুলি উদ্ধার করে পুলিশ
ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

পুলিশ জানায়, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলাকায় যেতে পারতেন না বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এলাকায় ফিরতে শুরু করেন তাঁরা। এরপর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিবাদ-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়েন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারীরা। বিভিন্ন সংঘর্ষ-হানাহানির ঘটনায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে আসছে।

গত বছরের অক্টোবরে হাটহাজারীর মদুনাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে গাড়িতে গুলি করে খুন করা হয় রাউজানের বিএনপিকর্মী আবদুল হাকিমকে। গাড়িতে ২২টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। গত বছরের অক্টোবরে তোলা
ছবি: সংগৃহীত

গতকাল যুবদল নেতা খুনের ঘটনায়ও দলীয় প্রতিপক্ষের দিকে অভিযোগ তোলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাউজানে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী বিএনপির এক নেতার প্রশ্রয়ে রয়েছেন। তাঁরাই আমার অনেক সভা-সমাবেশে হামলা করেছেন। গত এক বছরে আমার অনুসারী ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যুবদল নেতা জানে আলমকেও তারা হত্যা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘জানে আলম আমার খুবই বিশ্বস্ত সহকর্মী। তাঁকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ মাঠ দখলে রাখতে চায়। এভাবে আমার কর্মীদের শূন্য করে তারা রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে না।’

রাউজানে আমাকেও প্রকাশ্যে হামলা করা হয়েছিল। আমি চাই রাউজানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক।
গোলাম আকবর খন্দকার, সাবেক আহ্বায়ক, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি।

জানতে চাইলে গোলাম আকবর খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করেন। তাঁর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী নেই। তাঁর পক্ষের কোনো নেতা-কর্মী গোলাগুলিতে-হামলায় কখনো জড়ায়নি। এর পরও রাউজানে কিছু ঘটলে তাঁকে এবং তাঁর কর্মীদের দায়ী করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘রাউজানে আমাকেও প্রকাশ্যে হামলা করা হয়েছিল। আমি চাই রাউজানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হোক।’

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে রাউজানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গতকাল জানে আলমকে খুনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শিগগিরই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।