যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীর চুল কেটে পালালেন সেলুনকর্মী

যৌতুকের না পেয়ে স্বামী এই গৃহবধূর চুল কেটে দেন। সেই চুল নিয়ে আখাউড়া থানায় মামলা করতে যান ওই নারী। মঙ্গলবার বিকেলেছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে মারধর ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের রামধননগর গ্রামে এ ঘটনায় ওই নারী স্বামী, শ্বশুর–শাশুড়ির নামে মামলা করেছেন।

ভুক্তভোগী গৃহবধূর নাম মিম আক্তার (৩০)। তিনি আখাউড়ার আজমপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের মেয়ে। পাশের রামধননগর গ্রামের ইছহাক মিয়ার ছেলে দ্বীন ইসলাম ওরফে দিনু মিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাঁরা ২০১৯ সালে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন। তাঁদের সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলেসন্তান আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দ্বীন ইসলাম পেশায় সেলুনকর্মী। বর্তমানে নরসিংদীতে সেলুনে কাজ করেন। একসময় ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় একটি সেলুনে কাজ করতেন। কয়েক দিন ধরে নরসিংদীতে নতুন একটি সেলুন দিতে স্ত্রীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন দ্বীন ইসলাম ও তাঁর মা–বাবা। এতে রাজি না হওয়ায় প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন দ্বীন ইসলাম।

ওই গৃহবধূর পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার রাতে নরসিংদী থেকে স্ত্রীর কাছে শ্বশুরবাড়িতে আসেন দ্বীন ইসলাম। পরদিন সকালে যৌতুক হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা দিতে স্ত্রীকে চাপ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় স্ত্রীকে মারধর করেন স্বামী। যৌতুক হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা না দিলে আর সংসার করবেন না জানিয়ে স্ত্রীর মুঠোফোন নিয়ে চলে যান দ্বীন ইসলাম।

মিম জানান, মুঠোফোনের জন্য তিনি স্বামীকে একাধিকাবার কল করেন। বিকেলে মুঠোফোন দেওয়ার কথা বলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের হয়ে একটু সামনে যেতে বলেন দ্বীন ইসলাম। সেখানে গেলে তিনি স্বামীর মারধরের শিকার হন। এ সময় তাঁর কানে থাকা স্বর্ণালংকার খুলতে বললে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তখন তাঁর নাকে ঘুষি দেন স্বামী। মারধরের এক পর্যায়ে নতজানু হয়ে বসে পড়েন তিনি। চিৎকার করতে চাইলে মুখ চেপে ধরে রাখেন এবং হাত ও গালে ছুরিকাঘাত করেন। এসব থেকে রক্ষা পেতে একপর্যায়ে স্বামীর পায়ে ধরে আকুতি–মিনতি করেন। একপর্যায়ে দ্বীন ইসলাম রাগান্বিত হয়ে তাঁর মাথার চুল কেটে ফেলেন। এর মধ্যে পরিবারের লোকজন এগিয়ে এলে দ্বীন ইসলাম ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

পরিবারের লোকজন মিমকে উদ্ধার করে প্রথমে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

ওই গৃহবধূ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক থেকে দুই মাস ধরে সেলুন খোলার জন্য আমার কাছে যৌতুক হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা চাওয়া শুরু করে আমার স্বামী। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় মারধর করে আমার মুঠোফোন নিয়ে চলে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়, “পাঁচ লাখ টাকা দিবি, নইলে তরে ছাইড়া দিমু।” পরে বিকেলে মুঠোফোন দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে সামান্য দূরে নিয়ে মারধর করে চুলে কেটে দেয়। আমার স্বামী নরসিংদীতে অন্য নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছে।’

মিম জানান, এর আগে তিনবার কিস্তিতে স্বামীকে টাকা তুলে দিয়েছেন। প্রথমবার ৬০ হাজার, পরে ১ লাখ এবং সর্বশেষ ৩১ হাজার তুলে দিয়েছেন। এ ছাড়া কয়েক মাস আগে দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার বন্ধক দিয়ে তিন লাখ টাকাসহ মোট চার লাখ টাকা এনে দিয়েছেন। সেই টাকায় বিজয়নগর উপজেলার সিংগারবিল বাজারে কাপড়ের দোকান খুলেছিলেন স্বামী। এক বছর চালিয়ে দোকান বিক্রি করে দেন। ওই গৃহবধূ আরও বলেন, ‘স্বামী বাড়ি এলেই ঝগড়া করে। প্রায় মারধর করত। মারধর করে চলে যেত। দোকানের হিসাব চাইলেই মারধর করত।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে দ্বীন ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। মামলা হওয়ার পর থেকে তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ওই গৃহবধূর করা মামলায় এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে আজ বুধবার সকালে আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাবেদ উল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।