‘কত দিন অয় পোলাডার লগে কথা কই না, একটু দইরা দেখতে পারি নাই। পোলাডারে বোম দিয়া মাইরাইলো। ওরে তো আর পামু না। শেষবারের মতো একটু কাছ থেইকা দেখতে চাই, একটু দইরা দেখতে চাই।’
আজ বুধবার দুপুরে বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন লাকি বেগম (৫৫)। তাঁর ছেলে হবি মিয়া পাইক (৩৭) সম্প্রতি ইরাকের বাগদাদে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এক সহকর্মী।
হবি পাইকের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের বকুলতলা এলাকায়। লাকি বেগম ও নলি মিয়া দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে হবি ছিলেন মেজ।
২০১৬ সালে বাবা-মা, ভাই, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে রেখে ইরাকে গিয়েছিলেন হবি মিয়া। সেখানে তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে কাজ করতেন।
আজ দুপুরে বকুলতলায় হবি পাইকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বিলাপ করে কাঁদছেন তাঁর মা। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আর আক্ষেপ করে লাকি বেগম বলছিলেন, ‘১০ বছর আগে পোলারে দেখছি। বিদেশ যাওয়ার পর নিয়মিত ফোন করত। টাকাপয়সা কামাইয়া রাখতে পারত না। হের লাইগা গত ছয় মাস আগে গালাগালি করছিলাম। এরপর থেইকা পোলা আমার লগে কথা কইত না।’
হবি ইরাক যাওয়ার পর থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীতে বাবার বাড়িতে থাকেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আমার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। সেদিন তাঁর খুব মন খারাপ ছিল। চারদিকে মিসাইল হামলার ভয়াবহতার কথা বলছিলেন। যুদ্ধ শেষে বাড়ি চলে আসবেন বলেছিলেন।’
সেদিন ভিডিও কলে সন্তানদের দেখে হবি কষ্ট পাচ্ছিল জানিয়ে খাদিজা বলেন, ‘পরদিন শনিবার তাঁকে ফোন করে পাইনি। গত রোববার তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী আমাকে জানান হবিকে পুলিশে ধরেছে, এক সপ্তাহ পর জেল থেকে মুক্তি পাবে। গত সোমবার বিকেলে ওই প্রবাসীই আমাকে হবির মৃত্যুর খবর জানান। শুনেছি, মিসাইলের আঘাতে তাঁর দুই পা ও বুকে ক্ষত হয়েছিল।’
কথার একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে হবির স্ত্রী বলেন, ‘আমার মেয়েরা ওদের জীবিত বাবাকে আর পাবে না। অন্তত বাবার মৃত মুখ যেন দেখতে পায়। সরকার যেন দ্রুত তাঁর লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা করে।’
হবির ছোট ভাই ফিরোজ পাইক বলেন, ‘আমাদের শেষসম্বল একটি জমি বিক্রি করে ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। সেই যে গেল, ভাই আর দেশে আসতে পারল না। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধে আমার ভাই মরে গেল। শেষবারের মতো ভাইয়ের লাশটা আমরা দেখতে চাই।’
এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি, যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে মৃতদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনা যায়। সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’