আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সিলেটে জমিয়ত প্রার্থীর প্রচারণায় ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি ও সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স ইমরান আহমেদ তাপাদার। তিনি সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুকের পক্ষে জকিগঞ্জে প্রচারণা করেন।
২০১৬ সাল থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ইমরান আহমেদ প্রচারণার ছবি নিজেই গত ২৯ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন। পরে সমালোচনার মুখে তিনি ছবিগুলো সরিয়ে নেন। তবে তার আগেই ছবিগুলো ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিতে দেখা যায়, উবায়দুল্লাহ ফারুকের লিফলেট নিয়ে খেজুরগাছ প্রতীকে প্রচারণায় অংশ নেন ইমরান। এ সময় লাল টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় তাঁর সঙ্গে একাধিক যুবককে দেখা যায়। ফেসবুকে ছবি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘খেজুরগাছে ভোট দিন, বিএনপি জমিয়ত জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের সমর্থনে খেজুরগাছের গণসংযোগ চলছে জকিগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর কাজলশাহ ইউনিয়নের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের রায়গ্রাম কাজির পাতনে।’
সিলেট-৫ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী দেয়নি। এ আসনে বিএনপি জোট থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাশাপাশি বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মামুনুর রশীদ স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ‘বিদ্রোহী’ হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করেছে দল।
এ ছাড়া একটি ভিডিওতে ইমরান আহমেদ তাপাদারকে আরও কয়েকজন যুবকদের সঙ্গে খেজুরগাছ প্রতীকের স্লোগান দিতে দেখা গেছে। ইমরান আহমেদ তাপাদারের ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব। প্রচারণার ছবি ও ভিডিওগুলো সরিয়ে দিলেও বিএনপির সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীর সঙ্গে ছবি দিয়ে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন; পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারম্যানের ছবি দিয়েও তিনি ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট করেছেন।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২৫ (৩) ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অথবা অন্যত্র কোনো আইনসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অথবা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করা বা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করা বা প্রভাব খাটাতে পারবেন না।
প্রচারণায় অংশ না নিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালাতেও নির্দেশনা আছে। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫–এর ২০ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গের নির্বাচনী প্রচারণা, সরকারি সুবিধাভোগী অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ—তাহাদের নিজের বা অন্যের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি যানবাহন, সরকারি প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। এ উদ্দেশ্যে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্যবহার করতে পারবেন না।’
আচরণবিধির ২১ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তৎকর্তৃক মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী এলাকায়, সংশ্লিষ্ট জেলায় বা অন্য কোনো স্থানে নির্বাচনী কাজে সরকারি প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীগণকে ব্যবহার বা কোনোরূপ সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না।’
জানতে চাইলে ইমরান আহমেদ তাপাদার প্রথম আলোকে বলেন, আগে ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। চাকরির পর থেকে আর করেন না। বাড়িতে ছুটিতে ছিলেন। তখন কয়েকজন ‘জুনিয়র’ এসে প্রচারণা চালানোর কথা জানান। পরে তাঁরা গ্রামে গণসংযোগ করেন। এ সময় তাঁরা ছবি তুলে তাঁর আইডি থেকে এবং তাঁদের আইডি থেকে ছবি দিয়ে তাঁকে ট্যাগ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন জল ঘোলা করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিপক্ষ গ্রুপ আছে। বিএনপি–জমিয়ত জোটের প্রার্থী খেজুরগাছ। আর বিএনপির বিদ্রোহী মামুন ভাই। বিষয়টি হয়তো চোখে লেগেছে।’
বিষয়টি নজরে আনলে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমান বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।