জন্ম থেকে ডান হাত নেই নাহিদের, সব বাধা পেরিয়ে দিচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা
জন্ম থেকেই ডান অচল মো. নাহিদের। তবু থেমে থাকেনি তার পথচলা, থামেনি স্বপ্নও। বাঁ হাতেই স্বাভাবিক গতিতে লিখে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সে। পাশে আছে তার যমজ ভাই মো. নাছিম। দুজনেই বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিচ্ছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক শোক আর শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছে তাদের জীবনসংগ্রাম।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর শহরের শ্রীকৃষ্টপুর মহল্লায় তাদের বাড়ি। সংসারে নেই সচ্ছলতা, নেই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। আট বছর আগে বাবা নুরুল ইসলাম মারা যান। তিন বছর আগে হারিয়েছে বড় ভাই মোজাম্মেলকেও। বসতভিটার সামান্য জায়গা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। তবু জীবন থেমে থাকেনি। মা নাছিমা বিবি গরু লালন-পালন ও আলুর চিপসের কাজ করে, আবার কখনো ধারদেনা করে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন। অভাবের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন আঁকড়ে আছেন তিনি।
মো. নাহিদ ও মো. নাছিম আক্কেলপুর ফজরউদ্দিন সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আক্কেলপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে তারা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই কেন্দ্রের চার নম্বর কক্ষে বাঁ হাতে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে নাহিদ। ডান হাত কনুইয়ের নিচ থেকে নেই। অন্যান্য সুস্থ ও স্বাভাবিক পরীক্ষার্থীর মতোই বাঁ হাতে অনর্গল লিখে যাচ্ছে সে।
মো. নাহিদ বলে, ‘জন্ম থেকেই আমার ডান হাত নেই। বাম হাতেই স্বাভাবিক গতিতে লিখতে পারি। তাই পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।’ জীবনের লক্ষ্য ও ভবিষ্যতের কথা জিজ্ঞাসা করলে তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে বাস্তবতার চাপা কষ্ট। সে বলে, ‘আমাদের সংসারের যে অবস্থা, তাতে এসএসসি পর্যন্ত আসতে পেরেছি, এটাই বড় কথা। সামনে পড়াশোনা চালাতে পারব কি না, তা অনিশ্চিত। সেখানে বড় স্বপ্ন দেখাটা বোকামি মনে হয়।’ নাছিমও ভাইয়ের পাশে থেকে একই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দুই ভাইয়ের এই সংগ্রাম যেন একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠার গল্প।
মা নাছিমা বিবি বলেন, ‘জন্ম থেকেই নাহিদের ডান হাত নেই। তারপরও ও কখনো হাল ছাড়েনি। অনেক কষ্টে যমজ দুই ছেলেকে পড়াচ্ছি। আল্লাহ ভরসা, ওরা যেন মানুষ হতে পারে।’ তিনি জানান, আট বছর আগে নাহিদ ও নাছিমের বাবা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। স্বামীর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বড় ছেলে মোজাম্মেলও মারা গেছে। গরু লালন–পালন ও আলুর চিপস তৈরি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।
আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব মো. আবদুল মোমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাহিদ বাম হাত দিয়ে খুব সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে। তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তার মনোবল দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’
আক্কেলপুর ফজরউদ্দিন পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন বলেন, ‘নাহিদ অত্যন্ত মেধাবী ও আত্মপ্রত্যয়ী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার শিক্ষাজীবনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যথাযথ সহায়তা পেলে সে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।’