চার মাস পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, এরপর রাশিয়া থেকে এক বন্ধুর বার্তা—‘সাগর আর নেই’
পরিবারে সচ্ছলতা আনতে গত বছরের মাঝামাঝি রাশিয়ায় যান মোহাম্মদ সাগর। একটি বেকারিতে চাকরি নেন। এরপর দালালের প্রলোভনে বেশি বেতনের আশায় যোগ দেন রুশ সেনাবাহিনীতে। গত মে মাসে তাঁকে পাঠানো হয় ইউক্রেন যুদ্ধে। এর পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। এর মধ্যে গত শনিবার সাগরের বন্ধু রাজন মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠান। এতে শুধু লেখা ছিল, ‘সাগর আর নেই’।
এমন খবরে সাগরের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বন্ধু রাজনের এই বার্তা ছাড়া ২৪ বছর বয়সী সাগর সত্যিই মারা গেছেন কি না, সেটি আর কোনোভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। কখন, কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে তথ্যও অজানা।
সাগর যখন রাশিয়ার বেকারিতে চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কথা আমাকে জানায়, তখন আমি তাকে বারণ করেছিলাম। কারণ, সাগর লেখাপড়াই জানে না, সে বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে? ওই দেশে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি দালাল তাকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে।
কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা সাগর। অভাব-অনটনের কারণে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনো হয়নি। কিশোর বয়স থেকেই রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতে বাবাকে সহায়তা করতেন। সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পাড়ি জমান রাশিয়ায়। সেখানে একটি বেকারিতে কাজও পেয়েছিলেন।
রাশিয়ায় বাংলাদেশি এক দালালের প্রলোভনে পড়ে বেশি বেতনের আশায় বেকারির চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন সাগর। পরিবারের ভাষ্য, চলতি বছরের মে মাসে ওই দালালের মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্ত হন সাগর। এর পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
রাশিয়ায় থাকা রাজন গত শনিবার সাগরের বোনের মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে জানান, সাগর আর বেঁচে নেই। তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি রাজন। পরে বিস্তারিত জানাবেন বললেও আজ সোমবার পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা তাঁর কাছ থেকে আর কোনো তথ্য পাননি। এ ছাড়া রাজন সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেনি পরিবারটি।
সাগরের মারা যাওয়ার খবরে অনেকটা বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা দেলোয়ারা বেগম। সাগরের বাবা মো. কবির হোসেনের একটাই আকুতি, ছেলে বেঁচে আছেন কি না, অন্তত সেটুকু যেন নিশ্চিত হতে পারেন। আর সত্যিই মারা গিয়ে থাকলে ছেলের মরদেহ একবার দেখতে চান তিনি।
প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নেই। আমি এইটুকু জানতে চাই, সে কি আসলেই মারা গেছে? মারা গেলে ছেলেটার লাশটা অন্তত একবার দেখতে চাই।
দালালের প্রলোভনে যুদ্ধে
সাগরের পরিবারের সদস্যরা জানান, চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানের ভ্যান চালাতেন সাগর। ওই দোকানের ব্যবস্থাপক সোহেলের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে সোহেল চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে গেলেও তাঁদের যোগাযোগ ছিল। কয়েক বছর পর সোহেল দেশে ফিরে আবার ওই দোকানে চাকরি নেন। বন্ধুত্বের সূত্র ধরে সাগরকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন তিনি।
পরিবারের ভাষ্য, সোহেলের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর। সেখানে একটি বেকারিতে চাকরি নেন। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করছিলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, রাশিয়ায় এক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয় সাগরের। ওই ব্যক্তি তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান। সেই প্রলোভনে পড়ে চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন সাগর।
সাগরের চাচা আবদুল আওয়াল বলেন, ‘সাগর যখন রাশিয়ার বেকারিতে চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কথা আমাকে জানায়, তখন আমি তাকে বারণ করেছিলাম। কারণ, সাগর লেখাপড়াই জানে না, সে বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে? ওই দেশে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি দালাল তাকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে।’
আবদুল আওয়াল আরও বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাগর তাঁর ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এর পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শনিবার সাগরের বন্ধু রাজন বার্তা পাঠিয়ে মৃত্যুর খবর জানান। রাতে বিস্তারিত বলবেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সোমবার পর্যন্ত আর ফোন করেননি। পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে ফোনে পাচ্ছেন না।
তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সাগর সবার ছোট। সাগরের বাবা কবির হোসেন সবজির ব্যবসা করতেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে অসুস্থ। ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে অনেক ধারদেনা করতে হয়েছে তাঁকে। ছেলের বিদেশে যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে—এমন আশাও ছিল তাঁর।
কবির হোসেন বলেন, প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নেই। আমি এইটুকু জানতে চাই, সে কি আসলেই মারা গেছে? মারা গেলে ছেলেটার লাশটা অন্তত একবার দেখতে চাই।
সাগরের মৃত্যুর খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার বিকেলে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ তথ্য পেয়ে ওই যুবকের বাড়িতে পৌরসভার লোকজন পাঠিয়েছি। কিন্তু ছেলেটির বন্ধুর পাঠানো বার্তা ছাড়া সাগর নিহত হয়েছেন, এমন নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। আমরা এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি।’