পেশাদার খুনিদের দিয়ে নরসিংদীর ব্যবসায়ী শরৎকে হত্যা করা হয়েছে, অভিযোগ মায়ের
শরৎ চক্রবর্তী বই পড়তে ভালোবাসতেন, প্রকৃতি ভালোবাসতেন। পশুপাখির প্রতি ছিল খুব মায়া। জীবিকার তাগিদে ১০ বছর ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। এর মধ্যে ঘুরেছেন কয়েকটি দেশ। ব্যবসা করে দেশে থিতু হতে চেয়েছিলেন। নির্বিবাদী ও সব সময় হাসিখুশি এই শরৎকে কেউ খুন করে ফেলতে পারেন এটাই বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের সুলতানপুর এলাকায় গত সোমবার রাত ৯টার দিকে শরৎ চক্রবর্তী মণিকে (৪০) হত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি পার্শ্ববর্তী শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের উত্তর সাধারচর গ্রামের মদন মোহন চক্রবর্তীর ছেলে। শরৎ চরসিন্দুর বাজারে পৈতৃক মুদিদোকান পরিচালনার পাশাপাশি এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) ভাড়া দিতেন।
আজ বুধবার দুপুরে সরেজমিনে শিবপুর উপজেলার উত্তর সাধারচর গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়, জনা বিশেক স্থানীয় মানুষ বাড়ির উঠানে বসে নিহত শরতের মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ঘরের ভেতরে কান্না করছেন স্ত্রী অন্তরা মুখার্জী। তাঁকে ঘিরে রেখেছেন প্রতিবেশী নারী আর স্বজনেরা।
অন্তরা মুখার্জী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়িক অংশীদার রাজেন্দ্র চৌহানের সঙ্গে ইদানীং একটু বেশিই কথা হতো মুঠোফোনে। কথাবার্তায় বোঝা যেত, তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়েছে। দোকান বন্ধ করে প্রায় রাতেই আড্ডা দিতে সুলতানপুর চলে যেত। এসব নিয়ে কথা বললে পছন্দ করত না, বিরক্ত হতো। এমনকি তার ব্যবসার বিষয়েও পরিবারের সদস্যদের কিছুই জানাত না।
ব্যবসার কোথায় কী আছে, কত টাকা বিনিয়োগ—পরিবারের সদস্যরা এসব কিছুই জানেন না উল্লেখ করে অন্তরা মুখার্জী আরও বলেন, ‘সে (শরৎ) সাত দিন আগে আমাকে বলেছিল, “একটু সময় দাও, ব্যবসার হিসাবগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে ছেলে আর তোমাকে নিয়ে আমেরিকা চলে যাব।”’
অন্তরা মুখার্জী বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাকে যে সন্দেহ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। এই এলাকার হিন্দু-মুসলমান সবার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর ব্যবসার অংশীদার ছাড়া আর কাউকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারছি না।’
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ফিরে শরৎ চক্রবর্তী নরসিংদী শহরের মালাকার মোড়ে একটি তিনতলা বাড়ি করেন। গ্রামের বাড়ির একটি জমি ২২ লাখ টাকায় বিক্রি করে ওই টাকায় রাজেন্দ্র চৌহানের সঙ্গে সুলতানপুরে যৌথভাবে ১০ শতাংশ জমি কেনেন। এই জমি কেনার পর থেকেই সংসারে অশান্তি শুরু। তাঁর ওই বাড়িতে পরিবারের সদস্যরা কেউ যাননি। তাঁরা চাইতেন, ওই বাড়ি বিক্রি করে গ্রামে একটি ভালো বাড়ি করে দুই ভাই একসঙ্গে থাকুক।
শরতের মা গঙ্গা রানী চক্রবর্তী বলেন, ‘সুলতানপুরের ওই বাড়িতে একটি খরগোশ পালত শরৎ। সম্প্রতি খরগোশটি চারটি বাচ্চা দিয়েছে। ওই বাচ্চাগুলোরে খাবার দিতে ঘটনার রাতে বাড়িটিতে গিয়েছিল শরৎ। গেটের তালা খোলার সময়ই তার ঘাড়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। প্রথমে আমরা জেনেছিলাম ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল ময়নাতদন্তের পর আমরা জেনেছি তাকে গুলি করা হয়েছিল। গুলিটিও তার শরীর থেকে বের করে আনা হয়েছে।’
গঙ্গা রানী চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘আমার সন্দেহ তার পার্টনার বা বন্ধুদের কেউ এর সঙ্গে জড়িত। পেশাদার খুনিদের দিয়ে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমার বড় ছেলে হত্যায় জড়িতদের পুলিশ খুঁজে বের করুক। আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
উত্তর সাধারচর গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ১০ মিনিটের দূরত্বে সুলতানপুরের ওই বাড়ি। ঘটনাস্থলে গিয়ে কথা হয় শরতের ব্যবসায়িক অংশীদার রাজেন্দ্র চৌহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে তাঁরা একসঙ্গে বড় হয়েছেন। শরৎ বিদেশ থেকে ফেরার পর একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। দুজন মিলে জমি কিনে এই বাড়ি করেছেন। যখন তাঁকে হত্যা করা হয়, তখন তিনি ময়মনসিংহে সাইড অফিসে ছিলেন। তাঁর কারও সঙ্গে শত্রুতা আছে, এ নিয়ে কখনো কথা হয়নি।
গত সোমবার রাত ৯টার দিকে বাড়িটির ফটকের সামনে থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় শরৎ চক্রবর্তীকে স্থানীয় কয়েকজন উদ্ধার করে পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক। খবর পেয়ে স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে কুপিয়ে হত্যার বিষয়টি জানালেও গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ ও কর্তব্যরত চিকিৎসক। তাঁর ঘাড়ে প্রায় আড়াই ইঞ্চির দেবে যাওয়া আঘাত পর্যবেক্ষণ করে সে সময় থানার ওসি শাহেদ আল মামুন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছিলেন কুপিয়ে হত্যার কথা। পরে ময়নাতদন্ত শেষে রাতে জানা যায়, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহেদ আল মামুন আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শরতের বাবা মদন মোহন চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দ্রুত হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।