আর্জেন্টিনাকে ভালোবেসে ৪ হাজার ভক্তের শরীরে এঁকেছেন আকাশি-সাদা পতাকা
এক হাতে তুলি, অন্য হাতে আকাশি-সাদা রং। সামনে অপেক্ষা করছে ৩০ থেকে ৪০ শিশু-কিশোর। কেউ গাল এগিয়ে দিচ্ছে, কেউবা হাত। হঠাৎ একটি রিকশা এসে থামল। রিকশায় বসা শিশুর আবদার—তারও মুখে পতাকা এঁকে দিতে হবে। কোনো বিরক্তি নয়; তুলি হাতে রিকশার কাছে গিয়েই তিনি শিশুটির গালে এঁকে দিলেন আকাশি-সাদা পতাকা। এভাবেই হাসিমুখে প্রত্যেকের মুখে আর্জেন্টিনার পতাকা আঁকছেন তিনি।
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বনগ্রাম মহল্লায় চিত্রশিল্পী হাসমত আলী ওরফে টোকোনের (৪৮) বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল। আজ রাত একটায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ ঘিরে সকাল থেকেই তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। প্রিয় দলের খেলা দেখতে বন্ধুদের সঙ্গে উল্লাস করার প্রস্তুতি হিসেবে তাঁরা মুখে বা হাতে পতাকা আঁকিয়ে নিচ্ছেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপেও বিনা মূল্যে কয়েক হাজার মানুষের শরীরে আর্জেন্টিনার পতাকা এঁকে আলোচনায় এসেছিলেন হাসমত আলী। চার বছর পর সেই ভালোবাসা আরও বড় উৎসবে রূপ নিয়েছে। চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ছয়টি ম্যাচ ঘিরে তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের শরীরে পতাকা এঁকেছেন। আজ সেমিফাইনাল ঘিরে আরও পাঁচ শতাধিক ভক্তের শরীরে পতাকা আঁকতে হবে তাঁকে।
পেশায় চিত্রশিল্পী হাসমত আলী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, ব্যানার ও বিলবোর্ড আঁকেন। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই তাঁর তুলির কাজ যেন বদলে যায়। তখন তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আনন্দের অন্যতম কারিগর। আজ রাতে আর্জেন্টিনার খেলা থাকায় তাঁর ব্যস্ততা বেড়েছে।
হাসমত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি বলেই কাজটা করি। আমার স্ত্রী, দুই সন্তানসহ পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। কেউ পতাকা আঁকাতে এলে টাকা নেওয়ার কথা মনেই আসে না। মানুষের আনন্দের অংশ হতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ রাতে আর্জেন্টিনা জিতলে কাল থেকে আরও পতাকা আঁকতে হবে। এ পর্যন্ত রং কিনতে তাঁর পাঁচ থেকে ছয় শ টাকা খরচ হয়েছে। সামনে আরও লাগবে। তবে এটা তাঁর কাছে খরচ নয়, আনন্দ।
সরেজমিনে দেখা গেল, শুধু বনগ্রাম মহল্লা নয়, বেড়া পৌর এলাকার প্রায় সব পাড়া-মহল্লা থেকে শিশু-কিশোরেরা এসেছে। অনেকে বাইরের গ্রাম থেকেও এসেছে। বাড়ির পাশে সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক অভিভাবক রিকশা থামিয়ে সন্তানের মুখে পতাকা আঁকিয়ে নিচ্ছেন।
পতাকা আঁকাতে আসা রাব্বি ও সোহান বলে, আর্জেন্টিনার খেলা থাকলে হাসমত আলী চাচার কাছে চলে আসে। তাঁর আঁকা পতাকা খুব সুন্দর লাগে। পতাকা না আঁকিয়ে খেলা দেখার আনন্দই যেন পূর্ণ হয় না।
মনজুর কাদের মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্বকাপ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসব। হাসমত আলীর স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ সেই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। কোনো ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়াই তিনি শিশুদের আনন্দের অংশ হয়ে উঠেছেন।
আজ রাতে আর্জেন্টিনা জিতলে ভোর থেকেই আবার হাসমত আলীর উঠানে ভিড় জমবে শিশু-কিশোরদের। কারও গালে, কারও হাতে, আবার কারও কপালে তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠবে আকাশি-সাদা পতাকা। বিশ্বকাপের মৌসুমে এভাবেই একজন চিত্রশিল্পীর বাড়ি হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা-ভক্তদের ছোট্ট এক মিলনমেলা।