প্রি-টেস্টে চার বিষয়ে ফেল করা সাজিদই পেয়েছে জিপিএ-৫

শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কথা বলছে সাজিদ সরকার। নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। ১০ অক্টোবর ২০২৬ছবি: মীর হোসেন

সকাল ১০টা থেকে শুরু হবে অনুষ্ঠান; কিন্তু এই আনন্দ আয়োজনে যোগ দিতে সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি শুরু করে মাইনুল ইসলাম। সোনারগাঁ থেকে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসেছে সে। জিআর ইনস্টিটিউটের এই শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। যথাসময়ে শিখো-প্রথম আলো কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে মাইনুল।

মাইনুলের মতো শিক্ষার্থীদের পদচারণে আজ শনিবার সকাল থেকেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। কারও সঙ্গে এসেছেন মা-বাবা, কেউ এসেছেন স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে। কারও কাছে এটি ভালো ফলের স্বীকৃতি, কারও কাছে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ।

গান, নাচ, আড্ডা আর সেলফিতে নিজেদের অর্জনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার উপলক্ষও ছিল এই সংবর্ধনা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ছিল উৎসবমুখর।

ক্রেস্ট হাতে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
ছবি: প্রথম আলো

তবে এই আনন্দোৎসবে অংশ নিতে পারার পেছনে আছে কারও কারও লড়াইয়ের গল্প। যেমন সাজিদ সরকার। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী সাজিদের জন্য জিপিএ-৫ পাওয়ার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। পারিবারিক ও মানসিক কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছিল না সে। একসময় মানসিকভাবে ভেঙেও পড়েছিল। এসএসসির প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় চার বিষয়ে ফেল করে বসে সাজিদ। পরে টেস্ট পরীক্ষায়ও এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়।

এই ফলাফল হতাশ করে সাজিদকে; কিন্তু সেই হতাশার কাছে হার মানেনি সে। বোর্ড পরীক্ষার আগের দুই মাস পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোযোগ দেয়। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়েছে সাজিদ। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া—সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত সেই পরিশ্রমের ফল পায় সাজিদ। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাজিদ। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকার বাসিন্দা সে। সাজিদ বলল, চেষ্টা থাকলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।

ফটো ফ্রেমে ছবি তুলছে বন্ধুরা
ছবি: প্রথম আলো

মা-বাবাদের জন্যও দিনটি ছিল আনন্দের

নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ফাদিয়া চৌধুরী ফিমার কাছেও এই অর্জন আনন্দের। তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃতজ্ঞতা। মা-বাবা ও শিক্ষকদের অবদানের কথা তুলে ধরে সে বলে, তাদের সহযোগিতা ও চেষ্টার কারণেই ভালো ফল করা সম্ভব হয়েছে।

রূপগঞ্জের আবদুল হক হাই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া সাজিদা আক্তার এসেছে চার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে। দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সঙ্গে আবার দেখা, আড্ডা আর গান—সব মিলিয়ে দিনটি তার কাছে হয়ে উঠেছে আনন্দের। বন্দর গার্লস স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মায়িশা শাফিয়া নাসরিনের কাছে সংবর্ধনার আনন্দ অন্য রকম। কষ্ট করে অর্জন করা ফলের স্বীকৃতি পেয়ে সে আনন্দিত।

শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, তাদের মা-বাবার জন্যও দিনটি ছিল আনন্দের। সন্তানদের সাফল্য উদ্‌যাপন করতে এসে অভিভাবকেরাও ভাগাভাগি করেছেন নিজেদের অনুভূতি। কেউ সন্তানের ভালো ফলের জন্য গবির্ত, কেউ আবার এমন আয়োজনকে দেখছেন ভবিষ্যতে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা হিসেবে।

জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী আলীজানের অভিভাবক আমেনা বেগম বলেন, তাঁদের সময়ে এই সংবর্ধনার আয়োজন ছিল না। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের দেখতে এলাকার মানুষ যেতেন। এখন এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করতে উৎসাহিত করছে।

সৌমিক সরকারের মা কাজলী সরকার বলেন, সন্তান ভালো ফল করছে, তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে—এতে তাঁদেরও খুব ভালো লাগছে। সন্তানদের সঙ্গে তারাও আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। আরেক শিক্ষার্থী ইভানের মা সোহেলী আক্তার বলেন, এমন আয়োজন ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রেরণা জোগাবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

সাংস্কৃতিক পর্বে মূকাভিনয়ে মুগ্ধ হন দর্শকেরা
ছবি: প্রথম আলো

পড়াশোনার পরিশ্রম বিফলে যায় না

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ ও সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি মজিবুল হক। তিনি প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের চিঠি পড়ে শোনান।

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য দিদার-উল আলম বলেন, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সাফল্য আসতে পারে, আবার না–ও আসতে পারে; কিন্তু পড়াশোনার পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। তিনি বলেন, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া জীবনের চূড়ান্ত অর্জন নয়। তোমাদের সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কৈশোরের আনন্দ করার প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও ভবিষ্যৎ গড়তে সময়ের সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি।

নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, শিক্ষার্থীরা তোমরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে প্রবেশ করেছ। এখন নিজেদের সময় কীভাবে কাজে লাগাবে, তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি বলেন, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। সে বিবেচনায় তোমাদের এই অর্জন নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তোমরা খুব ভালো করেছ, তোমরা মেধাবী মুখ। তোমাদের এই ভালো ফলের জন্য শিক্ষক ও মা-বাবার অবদান বেশি। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং তাঁদের কথা শুনতে হবে।

অতিথিদের সঙ্গে কুইজ বিজয়ী শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যা, মিথ্যা ও মাদককে ‘না’ বলতে শপথ পাঠ করান নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমদ। আরও বক্তব্য দেন শিখোর মেন্টর রায়হান এ আর খান।

এরপর কুইজ বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপনী টানেন নারায়ণগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি সাব্বির আল ফাহাদ।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল গান, নাচ ও মূকাভিনয়ের মতো আয়োজন। অর্চনা একাডেমির শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। ‘মাইম ফেইস’ পরিবেশন করে মূকাভিনয়। গান পরিবেশন করেন কৃতী শিক্ষার্থী মুমতাহীনা রহমান। সবশেষে গান পরিবেশন করেন শিল্পী অনিক সূত্রধর।