স্টান্টবাজি আর চলবে না, শিক্ষার্থীরা তা দেখিয়ে দিয়েছে: হাসনাত আবদুল্লাহ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, স্টান্টবাজি আর বাংলাদেশে চলবে না, ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীরা তা দেখিয়ে দিয়েছে। প্রতিটি জায়গায় সরকার তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। বিএনপি সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। আজ মঙ্গলবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় এনসিপির পদযাত্রা কর্মসূচিতে তিনি এ কথা বলেন।
গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে দেশজুড়ে ৬ জুলাই থেকে মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি শুরু করেছে এনসিপি। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ সোনারগাঁয়ে পদযাত্রা কর্মসূচির আয়োজন করে সংগঠনটি।
শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকার এমন একজন শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছে, যিনি স্টান্টবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ওস্তাদ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নকল বন্ধের কথা বলা হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীরা নানা অব্যবস্থার শিকার হচ্ছে। হাঁটুসমান, কোথাও বুকসমান পানির মধ্য দিয়েও ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। একটি প্রশ্নপত্রে দুটি সৃজনশীল প্রশ্ন ভুল ছিল। প্রশ্নপত্রে ভুল দেখে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়ে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যবসায়ী, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। বিএনপি ও যুবদলের নেতাদের চাঁদা দিতে হয়, এমপিদের চাঁদা দিতে হয়। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই চাঁদাবাজির বাংলাদেশ আর চলবে না। যদি মনে করে থাকেন, এই চাঁদাবাজি চালিয়ে যাবেন, তাহলে মনে রাখবেন—এভাবে বেশি দিন টিকে থাকা যাবে না। প্রত্যেক দিন জুলাই হয় না, প্রত্যেক বছরও জুলাই হয় না; কিন্তু যখন জুলাই আসে, তখন পালানোর জায়গা পাবেন না।’
বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, বন্যার শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ওমরাহ পালনে বিদেশে যান। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বন্যায় দুর্ভোগে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফরে ব্যস্ত ছিলেন। বন্যাকবলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জন্য মাথাপিছু ৩০ টাকার কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই অঞ্চল থেকে এ বছর জাতীয় রাজস্বে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা হয়েছে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। আমরা শুধু শেখ হাসিনার পরিবর্তন চাইনি, আমরা হাসিনাব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছি; কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন হয়নি।’
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, যদি সংবিধান সংস্কার কমিটি সংবিধানে না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচনও সংবিধানে ছিল না। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। সংবিধান অনুযায়ী আপনার থাকার কথা শিলংয়ে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল লন্ডনে। সংবিধান অনুযায়ী আপনার নেতা–কর্মীর থাকার কথা ছিল ধানখেতে।’
পদযাত্রায় অংশ নেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমীন, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, কেন্দ্রীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিন মাহমুদ প্রমুখ।
‘আসি আসি বলে আর কোনো দিন আসবে না’
নারায়ণগঞ্জের পর মুন্সিগঞ্জে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নেন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে জেলার সিরাজদিখান উপজেলার নিমতলা এলাকায় অনুষ্ঠিত পথসভায় তিনি বলেন, ‘পালিয়ে যাবে না বলে যে পালিয়ে যায়, সে “আসি আসি” বলে আর কোনো দিন আসবে না।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের মিছিলের প্রসঙ্গ টেনে পথসভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনারা দেখছেন, নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন সময় “জয় বাংলা” স্লোগান ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের বলতে চাই, আপনারা যাঁর জন্য “জয় বাংলা” স্লোগান দেন, সেই শেখ হাসিনা আপনাদের নিয়ে আদৌ চিন্তা করেন কি না, একবার ভেবে দেখুন।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার নিজের ছেলে একজন মার্কিন নাগরিক। তাঁর মেয়ে কানাডার নাগরিকত্বধারী। তাঁর বোনের ও তাঁদের পরিবারের একজনও বাংলাদেশের নাগরিক নন। এরপরও আপনারা মনে করেন, তিনি আপনাদের বাঁচাতে দেশে ফিরে আসবেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি সত্যিই দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা থাকত, তাহলে গত বছরের আগস্টের শুরুতেই তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠিয়ে দিতেন না। বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন; কিন্তু আপনাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চিন্তা করেননি।’
সরকারের সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জনগণের স্বার্থের চেয়ে নির্বাচনের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। যে সরকার নির্বাচনের স্বার্থে জনগণের সঙ্গে ধোঁকা দিতে পারে, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও তারা জনগণকে ধোঁকা দিতে পারে।
তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা পথ হারিয়েছেন। মানুষের বুকের ওপর আঘাত করেছেন। যাঁদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ ক্ষমতায়, তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন না।’
সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘যাঁরা আজ বলছেন সংবিধান সংস্কারের সুযোগ নেই, তাঁদের মনে রাখা উচিত, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রচলিত সংবিধানের বাইরে গিয়ে তৈরি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী হলে নির্বাচন হতো চার বছর পর। আপনাদের নেতাদের জেলে, ধানখেতে থাকতে হতো। তিনি বলেন, সংবিধানের সুবিধাজনক অংশ মানা আর অসুবিধাজনক অংশ অস্বীকার করা গ্রহণযোগ্য নয়।’
পথসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মুন্সিগঞ্জ জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী মাজেদুল ইসলাম, সদস্যসচিব মারুফ হাসান, সিরাজদিখানের প্রধান সমন্বয়ক আলী নেওয়াজ, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।