দেশি গরু-মহিষে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী আদমপুর বাজার

বিক্রির জন্য খুঁটিতে বাঁধা হয়েছে গরু–মহিষ। শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরেছবি:  প্রথম আলো

কিছুক্ষণ আগেও ছিল ঝোড়ো হাওয়া, বৃষ্টি আর মেঘের বুককাঁপানো গর্জন। কিন্তু দুপুর গড়াতে গড়াতে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে মানুষের চলাচলও। একটি–দুটি করে গরু, মহিষ ও ছাগল নিয়ে গ্রামের কাঁচা-পাকা পথ ধরে বাইরে আসছিলেন তাঁরা। কারও হাতে দু–চারটা মোরগ, আছে রাজহাঁসও। কারও কাঁধে ও মাথায় শাকসবজির আঁটি। তাঁদের সবার গন্তব্য হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী আদমপুর বাজার।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পুরোনো বাজারটি গরু-মহিষের জন্য পরিচিত। এ বাজারের অন্যতম দিক হচ্ছে—বাজারে আসা অধিকাংশ গরু-মহিষগুলোই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। স্থানীয় কৃষক ও গৃহস্থরা ঘরোয়াভাবে এসব গবাদিপশু লালনপালন করেন। প্রাকৃতিক খাদ্যেই বেড়ে ওঠে পশুগুলো।

শুক্রবার দুপুরের পর কমলগঞ্জ সদরের উপজেলা চৌমোহনা থেকে আদমপুর বাজারের দিকে রওনা দিয়েই টের পাওয়া যায়, সামনে গরুর হাট। কিছুক্ষণ পরপর গরু, মহিষ ও ছাগল নিয়ে লোকজন সেখানে যাচ্ছেন। গরুবোঝাই একটি-দুটি পিকআপ ভ্যানও ছুটছে। বাজারের কাছে আসতেই ভিড় আরও বেড়ে যায়। কারণ, গতকালের হাট ছিল কোরবানির ঈদ সামনে রেখে।

কোরবানির আগে আগে হাটটির পরিসর বাড়ে। কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তসহ পাশের শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসেন। হাট থেকে দূরে যাঁদের বাড়ি, তাঁরা পিকআপ ভ্যানে করে কোরবানির পশু নিয়ে আসেন। বাজারের মুখেই গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছিল পশুগুলো। দেখতে দেখতে বাজারের খালি স্থান ভরে যায় গরু-মহিষে। এগুলোর দড়ি বাঁধার স্থান নিয়ে চলছে কাড়াকাড়ি।

ঘুরে ঘুরে গরু দেখছিলেন ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

ক্রেতা এসেই যাতে পশুটি দেখতে পারেন, এমন স্থানের দখল চাইছেন অনেক বিক্রেতা। এ নিয়ে বিক্রেতাদের মধ্যে মৃদু উত্তেজনাও তৈরি হয়—আবার সবাই মিলে তা মিটিয়েও ফেলেন। হাটের ইজারাদারের পক্ষ থেকে বারবার মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, ‘সবাই মিলেমিশে গরু–মহিষ রাখার ব্যবস্থা করেন।’

আদমপুর বাজারে বড় আকারের গরু খুব একটা চোখে পড়েনি। মাঝারি ও ছোট আকারের গরুই এখানে বেশি। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর এলাকার হায়দর মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এখানে যে গরু-মহিষ দেখা যাচ্ছে, এর অধিকাংশই ঘরোয়াভাবে পালিত দেশি জাতের। খামারে বেশি গরু নেই। তাঁর ভাষায়, ‘এর লাগি দেখুইন (দেখুন) গরু বেশি শক্তিশালী (তাজা) নায়। কিন্তু এই গরু-মইষর (মহিষের) মাংস খাইতে খুবই স্বাদের।’

হাটের দিকে মহিষ নিয়ে যাচ্ছেন এক বিক্রেতা
ছবি: প্রথম আলো

আদমপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও গ্রামের ফয়জুর রহমান জানিয়েছেন, স্থানীয় মানুষ ঈদ মাথায় রেখে একটি-দুটি গরু-মহিষ পালন করেন। সপ্তাহের সোমবারেও সাপ্তাহিক আরেকটি হাট বসে। তবে এটি শুক্রবারের হাটের মতো নয়। এই হাটবারে সকালবেলা সবজি-আনাজ বিক্রি হয় পাইকারিভাবে। দুপুরের পর থেকে শুরু হয় অন্য খুচরা পণ্যের কেনাবেচা।

গতকাল শুক্রবারের হাটটি ঈদের আগের বাজার হওয়াতে গরু-মহিষের দিকেই অধিকাংশের নজর ছিল। অনেকেই ঘুরে ঘুরে দরদাম করছেন। তবে অন্য পণ্যও কম ওঠেনি। আদমপুরসহ আশপাশের ইউনিয়নের প্রায় গ্রামেই নানা সবজি উৎপাদিত হয়। টাটকা সবজি কিনতে অনেক দূর থেকেও আদমপুর বাজারে আসেন ক্রেতারা। গরমমসলাও সাজিয়ে বসেছেন অনেকে। পান-সুপারি, শুকনা খাবার, বেতের তৈরি জিনিসও আছে। একপাশে মাছ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। দা, চাকু শানানোর কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে কামারের ঘরেও।

গরমমসলাও সাজিয়ে বসেছেন অনেকে
ছবি: প্রথম আলো

সময় যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়। আকাশে তখন জমাট বেঁধেছে কালো মেঘ। মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে ঝমঝমিয়ে নামবে বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি আসছি আসছি করেও একসময় উড়ে যায় মেঘ। ফোঁটায়–ফোঁটায় বৃষ্টি ঝরেছে—এটুকুই। ততক্ষণে বাজারটি গরু-মহিষ ও ছাগলে সম্পূর্ণ ভরে উঠেছে। তবে তখনো জমেনি বিক্রি। ক্রেতারা ঘুরছেন, পছন্দের কোরবানির পশুটি খুঁজছেন। নিজের চাহিদা ও আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে বোঝাপড়া করছেন। হাটটিও ক্রেতার পছন্দকে তুলে ধরতে প্রস্তুত হয়ে আছে।