গৃহস্থালিতে যা লাগে, সবই মেলে মৌলভীবাজারের শতবর্ষী এই বাজারে

বাঁশ-বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের দোকানে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতা। গতকাল বিকেলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা বাজারেছবি: প্রথম আলো

চারদিকে বদলে গেছে গ্রামবাংলার চেহারা। তবু সবকিছুর ভিড়ে কিছু হাট মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন আর গ্রামীণ জীবনের ভরসা হয়ে আজও রয়ে গেছে আগের মতোই। এমনই এক হাট টেংরা বাজার।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার এই বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এক ঐতিহ্যও বটে। স্থানীয়ভাবে টেংরা বাজার নামে পরিচিত হলেও হাটের ভেতরে আছে আরও দুই নাম—ভটের বাজার ও বাগিচা বাজার। প্রতিদিন স্থায়ী দোকানে বেচাকেনা চলে। তবে রোববার এলেই বাজার ভিন্ন রূপ নেয় সাপ্তাহিক হাটে হিসেবে।

হাটের বয়স নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে ছড়ায় ইতিহাস। দক্ষিণ দাসপাড়ার বাসিন্দা সুদর্শন মালাকার বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই বাজারে একসময় গোটা রাজনগর এলাকার সবচেয়ে বড় হাট ছিল। রোববার সকালে শুরু হয়ে অনেক সময় মধ্যরাত পেরিয়েও বেচাকেনা চলে।

হাটবারের বিকেলে বাজারে ঢুকতেই দেখা যায়, মানুষের ঢল, যানজট, রাস্তার দুই পাশে ভ্রাম্যমাণ দোকান—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত দৃশ্য। পূর্ব দিকজুড়ে হাঁস-মুরগি ও কবুতরের হাট, পাশেই বাঁশ-বেতের পণ্যের সারি। টুকরি, ঝাঁকা, খালুই, কুলা, চালুন, বেতের মাথাল—যেন গ্রামীণ জীবনের সব প্রয়োজন একসঙ্গে সাজানো। শীতলপাটি ও কেয়াপাতার পাটিও দেখা যায়। স্রোতের মতো আসা-যাওয়া করা মানুষ, কারও হাতে বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কারও হাতে হাঁস-মুরগি কিংবা সবজির ব্যাগ।

হাঁস-মুরগি নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা
ছবি: প্রথম আলো

এই হাটে নেই—এমন পণ্যের তালিকা করা কঠিন। গবাদিপশুর ঘাস, বাঁশ-বেতের তৈরি টুকরি, ঝাঁকা, খালুই, কুলা, চালুন, সেঁউতি, মাথাল—গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই এখানে মেলে। কেউ এনেছেন শীতলপাটি বা কেয়াপাতার পাটি, কেউ বসেছেন দা, কোদাল, খুন্তিসহ লোহার সামগ্রী নিয়ে। মৌসুমি সবজির বিশাল অংশে ভিড় লেগেই থাকে। খাসিয়া পান, বাংলা পান, সুপারি—সবকিছুরই আলাদা জায়গা আছে।

বাঁশ-বেতের পণ্য বিক্রেতা বীরেন্দ্র মালাকার বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এখানে পণ্য বিক্রি করছেন। তাঁর ভাষ্য, গেরস্তালির যা লাগে, এই বাজারেই মেলে। শহর থেকেও মানুষ আসে কিনতে।

খাসিয়া পান নিয়ে বসেছেন একজন বিক্রেতা
ছবি: প্রথম আলো

মাছের বাজারে চাষের মাছই বেশি পাওয়া যায়। অথচ একসময় হাওর-নদীর মাছেই ভরে উঠত বাজার, সেই দিন আর নেই। তবু কুশিয়ারা নদী কিংবা হাকালুকি হাওরের কিছু মাছ এখনো চোখে পড়ে।

হাটের পশ্চিম পাশে বসে গরু-ছাগলের হাট, তা–ও শুধু রোববারেই। সারি সারি গরু খুঁটিতে বাঁধা, পাশে ছাগলের ভিড়। ক্রেতারা ঘুরে দেখছেন, দরদাম করছেন, পছন্দ হলে কিনে নিচ্ছেন। সময় যত গড়ায়, ভিড় তত বাড়ে। এই হাটের নিয়মই এমন—বেচাকেনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।

স্থানীয় লোকজনের কাছে টেংরা বাজার কেবল একটি হাট নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা এক অভ্যাস। বদলে যাওয়া সময়ের মধ্যে এই বাজার আজও গ্রামবাংলার মানুষের সংস্কৃতি, সম্পর্ক আর জীবনযাপনের গল্প বয়ে নিয়ে চলছে।