বারবার দুর্ঘটনা, ট্রেনে কাটা পড়ে তিন বছরে ১০১ মৃত্যু

প্রতীকী ছবি

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ চালুর পর যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। পর্যটননির্ভর এই রেলপথে চালু হয়েছে চার জোড়া আন্তনগর ট্রেন। চলতি মাসে চালু হচ্ছে আরও এক জোড়া ট্রেন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার যাত্রী ট্রেনে করে কক্সবাজার যাতায়াত করছেন।

তবে জনপ্রিয় এই রেলপথে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে আহত হচ্ছেন যাত্রী ও রেলকর্মীরা। লেভেল ক্রসিংয়ে অন্য যানবাহনের সঙ্গে চারটি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের।

অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধকতা না থাকা, অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ না করা, ঢিল ছুড়ে মারার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং রেললাইন পারাপারে অসতর্কতার কারণে বারবার এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথে নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

৭২টির মধ্যে ৫৬টি লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত

এই রেলপথের দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে মোট ৭২টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে মাত্র ১৬টিতে। বাকি ৫৬টি অরক্ষিত। কোনো কোনো ক্রসিংয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও সেখানে গেটম্যান নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছু ক্রসিংয়ে সড়কের বাঁক, গাছপালা বা স্থাপনার কারণে ট্রেন আসার আগে সেটি দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা থাকে।

এই অরক্ষিত ক্রসিংয়ের কয়েকটিতে এরই মধ্যে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর সাতকানিয়ায় কাটগড় মোড় এলাকায় লেভেলে ক্রসিংয়ে অটোরিকশায় ট্রেনের ধাক্কায় দুজন নিহত হন। রেলওয়ের দাবি, এটি অবৈধ লেভেল ক্রসিং।

রেললাইনের লোহাগাড়া উপজেলা অংশের আধুনগর উচ্চবিদ্যালয়ের ২০০ মিটার পশ্চিমে তিন পথের মাথা সড়কে একটি গেট আছে। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে কোনো গেটম্যান নেই। তবে সড়কে রেললাইনের দুই পাশে দুটি করে পথচারী ও চালকদের সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড আছে। একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘সাবধান, এই গেটে কোনো গেটম্যান নাই। পথচারী ও যানবাহন নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন। যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না।’ আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা, ‘সাবধান, সামনে রেলপথ।’ তবে এসব সতর্কতা মানছেন না বেশির ভাগ পথচারী ও চালকেরা।

ট্রেনে কাটা পড়ে ১০১ মৃত্যু

লেভেল ক্রসিংয়ের বাইরে রেললাইনে কাটা পড়েও প্রাণহানি ঘটছে। রেলওয়ে পুলিশের হিসাবে, এই রেলপথে গত তিন বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে এই থানার অধীন রেলপথগুলোতে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ১৯০ জন। তাঁদের মধ্যে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে। ২০২৪ সালে ২৭ জন, ২০২৫ সালে ৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া কক্সবাজার রেলপথে যাত্রীদের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের এই রুটে চলাচলরত ট্রেনগুলোতে গত দেড় বছরে অন্তত ৫০ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মামুনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করলে ট্রেনে কাটা পড়ার দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এ ছাড়া ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ কমাতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।

জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ কক্সবাজার রেললাইনে যাত্রী যাতায়াতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি লুৎফুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজার রেললাইনের লেভেল ক্রসিংগুলোতে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধকতা না থাকায় দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছেন। ট্রেনগুলোতে দুর্বৃত্তরা প্রতিনিয়ত ঢিল ছোড়ে। এতে যাত্রীরা আতঙ্কে থাকেন। যাত্রীরা যাতে এই রকম জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ রেললাইন ব্যবহার করে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, সে জন্য রেলওয়েকে পদক্ষেপ নিতে হবে।