চট্টগ্রামে নতুন সেতু নির্মাণে বাধা এক্সপ্রেসওয়ে

জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাট সেতু (ডানে)। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (বাঁয়ে) কারণে নতুন সেতু নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় দেওয়ান হাট এলাকায়ছবি: জুয়েল শীল

চট্টগ্রাম নগরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ দেওয়ানহাট সেতু এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় অর্ধশতকের পুরোনো এই সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে চায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ওভারপাস। এই দুটি অবকাঠামোর কারণে নতুন সেতু নির্মাণের জায়গা নেই।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের জরিপে এই বাধা উঠে এসেছে। সম্প্রতি এই জরিপ করা হয়। পুরোনো জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে নতুন করে করার পরিকল্পনা নিয়েছিল সংস্থাটি।

রেলওয়ের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, রেললাইন থেকে নতুন সেতুর উচ্চতা হতে হবে অন্তত সাড়ে আট মিটার। বর্তমান সেতুর উচ্চতা সাড়ে পাঁচ মিটার। প্রায় তিন মিটার উচ্চতা বাড়াতে হলে সেতুর দৈর্ঘ্যও তিন গুণের বেশি বাড়াতে হবে। কিন্তু সেতুর এক পাশে দেওয়ানহাট ওভারপাস, তার ওপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে সেতু নির্মাণ করতে গেলে প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া যাবে না।

সেতুর উত্তর পাশে রয়েছে দেওয়ানহাট ওভারপাস। এর ওপর দিয়ে চলে গেছে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে নতুন সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য বাড়ানোর মতো জায়গা নেই। এ অবস্থায় প্রচলিত নকশায় নতুন সেতু নির্মাণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আনিসুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, দেওয়ানহাট সেতুর বর্তমান দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। রেলওয়ের নির্ধারিত উচ্চতা মেনে নতুন সেতু নির্মাণ করতে হলে এর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রায় ১৬০ মিটার করতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান দুটি অবকাঠামোর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন সেতুর বদলে পুরোনো সেতু আধুনিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী (রেট্রোফিটিং) করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, টাইগারপাস থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের ওপর সেতুটি নির্মিত হয় ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে। রেললাইনের কারণে যান চলাচলের বিঘ্ন দূর করতে তৎকালীন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এটি নির্মাণ করে। বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। প্রতিদিন অন্তত ৭৫ হাজার যানবাহন ৬০ ফুট প্রশস্ত এই সেতু ব্যবহার করে নগরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে যাতায়াত করে। নির্মাণকালে রেললাইন থেকে এর উচ্চতা ছিল ছয় মিটার। দীর্ঘদিন ব্যবহারে কিছু অংশ দেবে যাওয়ায় বর্তমানে উচ্চতা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটারে।

নগর-পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি অবকাঠামো নির্মাণের সময় ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

দেওয়ানহাট সেতুর বর্তমান দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। রেলওয়ের নির্ধারিত উচ্চতা মেনে নতুন সেতু নির্মাণ করতে হলে এর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রায় ১৬০ মিটার করতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান দুটি অবকাঠামোর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

আপত্তি ছিল, পাত্তা দেয়নি সিডিএ

দেওয়ানহাট ওভারপাস চালু হয় ২০১৩ সালে। পরে ওই ওভারপাসের ওপর দিয়ে এবং দেওয়ানহাট সেতুর পাশ দিয়ে নির্মিত হয় শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক নামের এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের লালখান বাজার প্রান্তের নকশা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম ও চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদ। তাদের প্রস্তাব ছিল, এক্সপ্রেসওয়েটি টাইগারপাসে না এনে দেওয়ানহাট ওভারপাসের দক্ষিণ পাশে শেখ মুজিব সড়কের প্রশস্ত অংশে শেষ করা হোক। এ বিষয়ে একাধিকবার সিডিএকে চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু নকশায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সেতুর উত্তর পাশে রয়েছে দেওয়ানহাট ওভারপাস। এর ওপর দিয়ে চলে গেছে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে নতুন সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য বাড়ানোর মতো জায়গা নেই। এ অবস্থায় প্রচলিত নকশায় নতুন সেতু নির্মাণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আনিসুর রহমান আরও বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে যদি দেওয়ানহাট সেতুটি যুক্ত করা হতো, তাহলে এই জটিলতা তৈরি হতো না। এখন সেতু নির্মাণের জায়গা না থাকায় রেট্রোফিটিংয়ের (শক্তিশালীকরণ) ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।

তিন ক্ষতিতে দুর্বল সেতু

সিটি করপোরেশনের জরিপে দেওয়ানহাট সেতুতে তিন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ধরা পড়েছে। এগুলো হচ্ছে কাঠামোগত, অতিরিক্ত চাপ ও যান্ত্রিক ত্রুটি। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, সেতুর কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছে সেতুর উপরিভাগে ফাটল, কংক্রিট খসে পড়া, রডের ক্ষয় এবং ডেকের নিচে রড বেরিয়ে আসার মতো সমস্যা।

অতিরিক্ত চাপজনিত ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, যে সময় সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন যে পরিমাণ ভার বহনের ক্ষমতা ধরা হয়েছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি ওজনের ভারী মালবাহী ট্রাক ও যানবাহন চলাচল করে। এতে সেতুটি আগের চেয়ে কিছুটা হলেও দেবে গেছে।

আর যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে রয়েছে সেতুর বিয়ারিংগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং এক্সপ্যানশন জয়েন্টগুলো ময়লায় আটকে যাওয়ায় তা ব্রিজের মূল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেতুর বিভিন্ন অংশে ক্ষয়, ফাটল ও দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এখন বিকল্প কী

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে যেখানে সেতু আছে, সেটি ভেঙে সেখানেই নতুন করে নির্মাণ করা। কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ে ও ওভারপাসের কারণে জায়গা না থাকায় রেলওয়ের উচ্চতা নীতিমালা অনুসরণ করে সেতু নির্মাণ করলে সেটি অনেক বেশি খাড়া হয়ে যাবে। তখন ভারী যানবাহন চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তেমনি ছোট গাড়িও চলতে পারবে না।

আরেকটি বিকল্প হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে নতুন সেতু যুক্ত করা। তবে এর জন্য ব্যাপক ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া লুপ নির্মাণেরও একটি প্রস্তাব রয়েছে। এতে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৪৪০ মিটার এবং র‍্যাম্পের দৈর্ঘ্য হবে ৫০০ মিটার।

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানান, এসব বিকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বিদ্যমান সেতুকে রেট্রোফিটিং বা শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেতুর ভারবহনক্ষমতা প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি সেতুটির আয়ুষ্কাল আরও ২৫-৩০ বছর বৃদ্ধি পাবে।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের কোষাধ্যক্ষ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন যে একটি নগরের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নষ্ট করে, তার প্রকৃত উদাহরণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও দেওয়ানহাট ওভারপাস। দেওয়ানহাট সেতুর নাজুক অবস্থা এবং এটির পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগে থেকেই জানত। সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। নতুন সেতু জরুরি। এখন উচ্চতা মেনে নতুন করে সেতুটি নির্মাণের জায়গা নেই। খণ্ডিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এক্সপ্রেসওয়ে ও ওভারপাস প্রকল্প বাস্তবায়ন না করতে সিডিএকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে গায়ের জোরে কাজ করেছে সিডিএ। এখন এর খেসারত দিতে হচ্ছে।