কোদালের কোপে বেরিয়ে আসে ছয়টি ধাতব বস্তু, পাওয়া গেল ৯৬টি মাইন
বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কাটছিলেন শ্রমিকেরা। কোদালের আঘাতে বেরিয়ে এসেছিল ছয়টি ধাতব বস্তু। দুই দিন পর সেই জায়গা খুঁড়ে ৯৬টি মাইন উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী একটি দল। ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনীর বেতবাড়িয়া গ্রামে।
আজ বেলা দেড়টার দিকে যশোর সেনানিবাস থেকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেনাসদস্যরা প্রথমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুরো এলাকা পরীক্ষা করে খনন শুরু করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একের পর এক ৯৬টি মাইন উদ্ধার করা হয়। এ সময় পুলিশ ও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) একটি দল পুরো এলাকা ঘিরে রাখে।
সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয় দল আজ দুপুরে বেতবাড়িয়া গ্রামে ঘটনাস্থলে এসে খনন শুরু করে। একের পর এক অ্যান্টি–ট্যাংক মাইন উদ্ধার করা হয় ১৭টি এবং মানববিধ্বংসী অ্যান্টি পারসোনেল মাইন উদ্ধার হয় ৭৯টি।
ঘটনাস্থল থেকে গাংনী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শিমুল কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেন, সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয় দল আজ দুপুরে বেতবাড়িয়া গ্রামে ঘটনাস্থলে এসে খনন শুরু করে। একে একে অ্যান্টি–ট্যাংক মাইন উদ্ধার করা হয় ১৭টি এবং মানববিধ্বংসী অ্যান্টি পারসোনেল মাইন উদ্ধার হয় ৭৯টি। জায়গাটির বেশির ভাগ স্থানে খনন করা হয়। মাইনগুলো উদ্ধারের পরে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য সেনাবাহিনী পাশের মধুগাড়ি মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে মাইনগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজ চলছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অ্যান্টি পারসোনেল মাইনের ওপর ৬৪ কেজি ওজনের কোনো কিছুর চাপ পড়লে তা বিস্ফোরিত হয়। এর চেয়ে ভারী কিছুর চাপে বিস্ফোরিত হয় অ্যান্টি ট্যাংক মাইন।
মাটি খুঁড়তে গিয়ে একসঙ্গে এত বড় মাইনের মজুত উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া মাইনগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কৌশলগত কারণে পুঁতে রাখতে পারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
দৌলতপুর ব্যাংগাড়ি হানাদার ক্যাম্পে আমরা যখন আক্রমণ করি তখন ভোরের সূর্য ওঠেনি। হঠাৎ আক্রমণে হানাদার বাহিনী দিকশূন্য হয়ে গাড়ি, ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে যায় কুষ্টিয়ার দিকে। পরে আমরা ক্যাম্প দখল নিই। বেতবাড়িয়া গ্রামে যেখানে মাইন পাওয়া গেছে, ওই সড়কে দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র সরঞ্জাম নিয়ে পালিয়েছিল।
স্থানীয় প্রবীণ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান জানান, বেতবাড়িয়া গ্রামের ১০ কিলোমিটার মধ্যে বেংগাড়ি মাঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। ১৯৭১ সালে এখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখযুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় মাইনগুলো এখানে ফেলে রেখে যেতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান, যে স্থানে মাইনগুলো পাওয়া গেছে, সেখান থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ গ্রামের বেংগাড়ি মাঠ। ওই মাঠে ১৯৭১ সালের ১১–১২ নভেম্বর হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত ওয়ালিউল হোসেনসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্য শহীদ হন। একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর লাগাতার আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেতবাড়িয়া গ্রাম হয়ে কুষ্টিয়া সদরে চলে যায়। যাওয়ার সময় মাইনগুলো তারা ওই গ্রামের পরিত্যক্ত স্থানটিতে পুঁতে যেতে পারে।
ব্যাংগাড়ি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া গাংনী উপজেলার কাজিপুর ইউনিয়নের কাজিপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দৌলতপুর ব্যাংগাড়ি হানাদার ক্যাম্পে আমরা যখন আক্রমণ করি তখন ভোরের সূর্য ওঠেনি। হঠাৎ আক্রমণে হানাদার বাহিনী দিকশূন্য হয়ে গাড়ি, ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে যায় কুষ্টিয়ার দিকে। পরে আমরা ক্যাম্প দখল নিই। বেতবাড়িয়া গ্রামে যেখানে মাইন পাওয়া গেছে, ওই সড়কে দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র সরঞ্জাম নিয়ে পালিয়েছিল। কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে খলিশাকুণ্ডি এলাকায় আবারও তাদের ওপরে হামলা করা হয়। পরে একটি সেতু বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলাম আমরা।’
এর আগে গত শনিবার বেতবাড়িয়া গ্রামের প্রবাসী নুরুজ্জামান কালু তাঁর ৭ শতাংশ জমিতে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কাটছিলেন শ্রমিকেরা। এ সময় ধাতব ছয়টি বস্তু দেখতে পান তাঁরা। বস্তুগুলোর গায়ে লেখা ‘পি ডি এফ জি এল ৬৩, লট ৩৭, মাইন ১৯৬৭’। খবর পেয়ে পুলিশ এসে জায়গাটি ঘিরে ফেলে এবং নিরাপত্তা জোরদার করে। এগুলো উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জামিনুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, মাইনসদৃশ বস্তু দেখার পর সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেই সঙ্গে জায়গাটি পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। মাইনগুলো উদ্ধার করে সেনাবাহিনী তাদের হেফাজতে নিয়ে গেছে। সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজ চলছে।