‘ঈদের ছুটিতে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে এসে দুই বাপ-বেটা মিলে বাড়ির কাজ করছিলাম। কাজ শেষে বাড়ির সামনেই মহানন্দা নদীতে গোসল করতে নেমে নিজেই বললাম, চলো বাপ-বেটা মিলে নদীর ওপার থেকে সাঁতার দিয়ে আসি। এই বলে গোসল করতে নেমে সাঁতার দিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে ছেলে বলল, “বাবা, আর পারছি না। পায়ে লুঙ্গি পেঁচিয়ে গেছে।” তাকে তলিয়ে যেতে দেখে আমি একাধিকবার ডুব দিয়ে ওপরের দিকে ধাক্কা দিতে থাকলাম। একপর্যায়ে ধাক্কা দিতে আমার দম ফুরিয়ে গেল। আমি ডুবতে বসলাম। নদীপাড়ের এক মাঝি এসে আমাকে উদ্ধার করল। কিন্তু ততক্ষণে আমার ছেলেটা পানিতে ডুবে মারা গেল।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দ্বারিয়াপুরে মহানন্দা নদীতে গতকাল মঙ্গলবার গোসল করতে নেমে বাবার সঙ্গে সাঁতরে নদী পার হতে গিয়ে ডুবে মারা যায় রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মাহিনুজ্জামান (১৭)। আজ বুধবার দুপুরে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আহাজারি করছিলেন বাবা কৃষিবিদ রোকনউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি বাবা হয়ে ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই সবকিছু শেষ। আর নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে আমার ছোট ছেলেটা এই দৃশ্য দেখছিল, আহাজারি করছিল। আমি নিজে মারা গিয়ে যদি ছেলেটা বাঁচত, সেটাই ভালো হতো।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের দ্বারিয়াপুর গ্রামের কলেজছাত্র মাহিনুজ্জামান ভালো অ্যাথলেটও ছিল। রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র হিসেবে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার জিতেছে সে। তার পুরস্কার–মেডেলে বাড়ির আলমারি ভরা। সে সাঁতারও জানত। খবর পেয়ে ওই দিনই রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসে মাহিনুজ্জামানের লাশ উদ্ধার করে।
নদীর যে স্থানটিতে মাহিনুজ্জামান ডুবে মারা যায়, ঠিক এর সামনেই পাড়ে বসে বাবা রোকনউজ্জামান এসব বলছিলেন। এ সময় ছোট ছেলে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিমুজ্জামান মাথা নিচু করে নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। ছোট ছেলেকে দেখিয়ে রোকনউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই ভাই চলত ঠিক বন্ধুর মতো। একসঙ্গে স্কুলে যেত–আসত। খেলতেও যেত একসঙ্গে। সে বড় একা হয়ে গেল। বড় ভাইয়ের অভাব সে সারা জীবন বয়ে বেড়াবে।’
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের মানুষেরা জানান, মাহিনুজ্জামান খুব মেধাবী ও ভালো ছেলে ছিল। তার এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা গ্রামের মানুষ শোকাহত। মঙ্গলবার রাতে তার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২০-২৫ জন বন্ধু এসেছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সে খুব জনপ্রিয় ছিল।