কক্সবাজার সৈকতে ‘স্মার্ট চা–ওয়ালা’, পাওয়া যায় ১২ রকমের চা
কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকায় ‘স্মার্ট চা–ওয়ালা’ নামের দোকানটি এখন হয়ে উঠেছে পর্যটকদের আড্ডার নতুন জায়গা। ভিন্ন স্বাদের ১২ রকমের চায়ের কারণে দোকানটি সবার নজর কেড়েছে।
শহরজুড়েই চায়ের দোকান। তবে এসবের ভিড়ে নজর কাড়ে একটি ব্যানার। এতে লেখা—‘স্মার্ট চা–ওয়ালা’। দোকানটি ঘিরেই মানুষের আগ্রহ। সকাল থেকে সন্ধ্যা, এতে ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
কক্সবাজারের ঝাউতলার প্রধান সড়কের পাশের কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচতলায় দোকানটির অবস্থান। এটি পরিচালনা করেন মোহাম্মদ নোমান (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। মাল্টা, পুদিনাপাতা, তেঁতুল থেকে শুরু করে মধু-লেবু—ভিন্ন স্বাদের ১২ রকমের চায়ের কারণে শহরজুড়ে নাম ছড়িয়েছে তাঁর।
শুরুর দিকে সাধারণ চা বিক্রি করতাম, তেমন বিক্রি হতো না। চায়ে ভিন্নতা আনার পর ক্রেতা বেড়েছে। এখন অনেকে ছবি তোলে, টিকটক-ইউটিউব-ফেসবুকে রিল বানায়। ভালোই লাগে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দোকানটিতে দেখা যায়, শার্টের ওপর কোট, হাতে গ্লাভস ও মাথায় গেরুয়া ক্যাপ পরে চা বানাচ্ছেন নোমান। দোকানেও ভিড় করেছেন তরুণ-যুবক থেকে শুরু করে সব বয়সী পর্যটক ও স্থানীয় লোকজন। তাঁদের কেউ দাঁড়িয়ে, আর কেউ বসে রয়েছেন। তাঁদের একজন সাজিদ আহমেদ (২৮)। তিনি গাজীপুর থেকে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৈকতের কয়েকটি দোকানে চা খেলেও এ দোকানের চা আলাদা। নানা রকমের ফল ও মসলার মিশ্রণের কারণে এর স্বাদও অতুলনীয়।’
গ্রাহকের সুবিধার্থে দোকানের এক কোণে টানিয়ে রাখা হয়েছে চায়ের মূল্যতালিকা। এতে চোখ বুলিয়ে দেখা গেল, সাধারণ চা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মাল্টা চা, দুধ-কফি মিক্সড চা, মিক্সড মসলা চা, গ্রিন টি, পুদিনাপাতা চা, টক–ঝাল (চিলি) চা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। এর বাইরে মধু-লেবু চা আর তেঁতুল চা ৩০ টাকা, ‘আদানি’ ও কপি চা ৪০ টাকা এবং কাজুবাদাম চা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে আসা পর্যটক তাজনুর বেগম (২৫) প্রথম আলোকে বলেন, অনেক জায়গায় চা খেয়েছেন। তবে এখানকার চা তাঁর কাছে ব্যতিক্রম লেগেছে। মাল্টা ও পুদিনাপাতার মিশ্রণের এমন স্বাদ আগে পাননি। তাই সৈকত এলাকা থেকে এত দূর তিনি চা খেতে এসেছেন।
যেভাবে শুরু
নোমানের বাড়ি ভোলার ব্যাংকেরহাটের চররমেশ গ্রামে। সাত বছর আগে জীবিকার সন্ধানে কক্সবাজারে আসেন তিনি। শুরুতে ঝাউতলা গাড়ির মাঠ এলাকায় একটি কুলিং কর্নার খুললেও লোকসানের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি ব্যবসা গুটিয়ে গ্রামে ফিরে যান। সেখান থেকে দ্বিতীয় দফায় মনোবল নিয়ে আবার কক্সবাজার ফেরেন।
নোমান জানান, দ্বিতীয় দফায় কক্সবাজার ফিরে পর্যটকদের চাহিদা রয়েছে—এমন কিছু করার কথা ভাবতে থাকেন তিনি। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক দিন শহরও ঘুরে দেখেন। একপর্যায়ে বুঝতে পারেন পর্যটকদের আড্ডার প্রধান অনুষঙ্গ চা। কিন্তু প্রায় সব দোকানের চা একই রকম। সেখান থেকেই ভিন্ন কিছু করার চিন্তা আসে তাঁর মাথায়। দুই লাখ টাকা জমা দিয়ে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে শুরু করেন নতুন যাত্রা। নাম দেন ‘স্মার্ট চা–ওয়ালা’।
মোহাম্মদ নোমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুলিং কর্নারে লোকসানের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন মানুষ চা খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। সংসার ভালোভাবেই চলছে। যেদিকে যাই, সবাই স্মার্ট চা–ওয়ালা নামে ডাকে। দোকানে এখন সব শ্রেণি–পেশার মানুষ আড্ডা দেন।’
নোমানের সংসারে মা, স্ত্রী ও ১০ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। সে মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগে পড়ছে। চায়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এখন প্রচার করেন ধূমপান ও মাদকবিরোধী বার্তাও। দোকানের পাশে টাঙানো একটি প্ল্যাকার্ডে নোমান লিখেছেন—‘ধূমপানকে “না” বলুন, সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন’।
নোমান বলেন, ‘শুরুর দিকে সাধারণ চা বিক্রি করতাম, তেমন বিক্রি হতো না। চায়ে ভিন্নতা আনার পর ক্রেতা বেড়েছে। এখন অনেকে ছবি তোলে, টিকটক-ইউটিউব-ফেসবুকে রিল বানায়। ভালোই লাগে।’
নোমানের চায়ের প্রশংসা করেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। স্থানীয় সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নোমানের বানানো চা মানসিক প্রশান্তি দেয়। সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে আমি এ চা খাই।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার বলেন, ‘বাইরে চা খাওয়ার অভ্যাস নেই। কিন্তু নোমানের তেঁতুল চা নিয়মিত খাই।’