এই বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের লাঠি-বাঁশি সরবরাহ দিচ্ছে ১৪ আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশ (এপিবিএন)। বর্তমানে উখিয়ার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, বালুখালী, হাকিমপাড়াসহ ১৫টি আশ্রয়শিবিরে এ রকম লাঠি-বাঁশি বাহিনীর পাহারা চলছে বলে জানান ১৪ এপিবিএন-অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার নাইমুল হক। তিনি বলেন, পাহারা থাকায় আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ঢুকতে পারছে না। ঢুকলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। মাদক চোরাচালান, মানব পাচারও কমে এসেছে। ইয়াবা ও অস্ত্র নিয়ে প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে।

পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মহিবুল্লাহ। এই হত্যাকাণ্ডের পর আশ্রয়শিবিরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ১৪ এপিবিএন পুলিশ তাদের আওতাধীন ১৫টি আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের দিয়ে স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা চালু করে। এখন পাঁচ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় রাত জেগে পাহারা দিয়ে আসছে। এর সুফল ভোগ করছে আশ্রয়শিবিরগুলোর ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। লাঠি-বাঁশি বাহিনীর নাম দেয়া হয়েছে ‘স্বেচ্ছায় পাহারা দেওয়া ভলান্টিয়ার সার্ভিস’।

default-image

রোহিঙ্গাদের দিয়ে লাঠি-বাঁশি বাহিনী গঠনের আইনগত ভিত্তি প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, এটি পুরোনো ধারণা বা প্রচলিত পদ্ধতি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কর্তৃক দেশের বিভিন্ন জেলায় এ ধরনের বাহিনী গঠনের নজির আছে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম। বিশেষ করে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, মাদক চোরাচালান, মানব পাচার রোধে যুবক-তরুণেরা রাতে লাঠি হাতে বাঁশি বাজিয়ে তাঁদের এলাকা পাহারা দিচ্ছেন। তাঁদের তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন এপিবিএন কর্মকর্তারা। প্রতি রাতে পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর তৎপরতা তদারকি করে।

এপিবিএন কর্মকর্তারা বলেন, স্বেচ্ছায় পাহারা দেওয়া ভলান্টিয়ার সার্ভিস’ প্রথম দিকে সাড়া পায়নি। পরে এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বিট পুলিশিং সভা, কমিউনিটি পুলিশিং সভা, মতবিনিময় সভায় করে রোহিঙ্গাদের বোঝানো হয়। এখন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের মা–বোনদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের মাধ্যমে ক্যাম্পের শান্তি–শৃঙ্থলা বজায় রাখছেন।

সর্বশেষ ১১ জুলাই উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে ইরানি পাহাড়ের পুলিশ ক্যাম্পে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীদের মতবিনিময় সভা শেষে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর হাতে লাঠি ও বাঁশি তুলে দেন ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক নাইমুল হক।

উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা ছৈয়দ উল্লাহ বলেন, লাঠি-বাঁশি বাহিনীর কর্মকাণ্ডে সাধারণ রোহিঙ্গারা খুশি। এখন রাতে কেউ ক্যাম্পে ঢুকলে সঙ্গে সঙ্গে বেজে ওঠে বাঁশির সুর। ক্যাম্পে ঢোকার কারণ ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, কার বাড়িতে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে জবাবদিহি করতে হয় বাহিনীর কাছে। স্বেচ্ছাসেবীদের সংকেত কেউ না মানলে লাঠি হাতে তাড়িয়ে ধরা হয় সেই লোককে। তারপর তুলে দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে।

মধুরছড়া ক্যাম্পে লাঠি-বাঁশি বাহিনীর সদস্য রোহিঙ্গা যুবক আমান উল্লাহ বলেন, ‘লাঠি-বাঁশি দিয়ে আমরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। বহিরাগত কেউ যেন ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে, সে জন্য রাত জেগে পাহারা বসাই। মাদক চোরাচালান কিংবা মানব পাচারের খবর পেলে পুলিশকে খবর দিচ্ছি। আইন আমরা হাতে তুলে নিচ্ছি না। পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ক্যাম্পের শান্তি–শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারীদের ব্যাপারে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছি।’

স্বেচ্ছাসেবীরা বলেন, তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এপিবিএন সদস্যরা কয়েক মাস আগে লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারের সশস্ত্রগোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) প্রধান আতাউল্লাহ আম্মার জুনুনির আপন ভাই শাহ আলীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তা ছাড়া মুহিবুল্লাহ হত্যা এবং চাঞ্চল্যকর ছয় রোহিঙ্গা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ১০-১২ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে লাঠি বাহিনীর তথ্যের ভিত্তিতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের প্রাণনাশ, অপহরণ ও গুমের হুমকি এবং ভীতি প্রদর্শন করছে সন্ত্রাসীরা। তারপরও স্বেচ্ছাসেবীরা লাঠি-বাঁশি নিয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

১৪ এপিবিএন অধিনায়ক নাইমুল হক বলেন, আগে ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড হলে আসামি গ্রেপ্তারে সমস্যায় পড়তে হতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। পাহাড়ের ঘরবসতি ও ঝুপড়ি ঘরে আসামি শনাক্ত করা কঠিন। এখন স্বেচ্ছাসেবীরা আসামি কিংবা সন্ত্রাসীদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে। ফলে আসামিদের সহজে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফের অন্যান্য ক্যাম্পগুলোতেও এই ‘স্বেচ্ছা পাহারা দেওয়া ভলান্টিয়ার সার্ভিস’ চালু করা হবে বলে জানান এপিবিএন অধিনায়ক নাইমুল।

উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরবর্তী কয়েক মাসে। নানা সংকটে গত পাঁচ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন