নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশায় শহরে যানজট বেড়েছে

পৌরসভার হিসাবে, শহরে তিন চাকার নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৬৫৯।

নেত্রকোনা জেলা শহরে অটোরিকশায় করে মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো এক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এর কারণ যানজট। অন্যদিকে যানজটের অন্যতম কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্তি অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল।

নেত্রকোনা পৌরসভার হিসাবে, শহরে নিবন্ধিত ইজিবাইক, মিশুক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৬৫৯। বাস্তবে শহরে চলাচল করা অটোরিকশার সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারের বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

শহরের সাতপাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা হেলেনা খাতুন জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে চাকরি করেন। তাঁর বাসা থেকে শহরের মোক্তারপাড়ার কর্মস্থলের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। তিনি বলেন, আগে ইজিবাইক বা রিকশায় করে অফিসে যেতে তাঁর সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগত। এখন লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।

যানজট নিয়ে স্থানীয় ১০ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ছোট শহরে প্রয়োজনের তুলনায় তিন চাকার অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি। আবার কিছু অটোরিকশায় আটজনের বসার ব্যবস্থা থাকলেও যাত্রী থাকেন দুই থেকে চারজন। বড় আকারের এসব অটোরিকশা সড়কে বেশি জায়গা দখল করে। এ কারণে যানজটও বেশি হচ্ছে।

শহরে যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড করা ও সড়ক দখলমুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।
খন্দকার মুশফিকুর রহমান, জেলা প্রশাসক, নেত্রকোনা

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শহরে যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড করা ও সড়ক দখলমুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কেন বাড়ছে যানজট

নেত্রকোনা পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৭ সালে গঠিত এ পৌরসভার আয়তন ২১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। পৌর এলাকায় মোট ৯৩ কিলোমিটার সড়ক আছে।

শহরের বনোয়াপাড়া মোড় থেকে মোক্তারপাড়া সেতু হয়ে রাজুরবাজার পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় যানজট বেশি হয়। এ ছাড়া তেরিবাজার থেকে সাতপাই চানখার মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, আখড়া মোড় থেকে বড়বাজার হয়ে মালনী মোড় পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার এবং মোক্তারপাড়া সেতু এলাকা থেকে পারলা বাসস্টেশন পর্যন্ত এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে যানজট হয়। এসব সড়কের দুই পাশে বাজার, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও হাসপাতাল আছে।

বনোয়াপাড়ার আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাঈক সাফওয়ানের বাসা জেলা পরিষদের পেছনে। তার বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। রিকশায় এ পথ পাড়ি দিতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে বলে জানায় সে।

জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, সড়কের তুলনায় শহরে যানবাহনের সংখ্যা বেশি। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপও আগের চেয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া যত্রতত্র পার্কিং, রাস্তার পাশে বাজার এবং অনেক এলাকায় ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় শহরে যানজট বাড়ছে।

ছোট বাজার এলাকার বাসিন্দা আজাহারুল ইসলাম বলেন, ইজিবাইক বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা হবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে জড়িত। তবে নিয়ন্ত্রণ দরকার। ইজিবাইকের পাশাপাশি রাস্তার পাশে বাজারও যানজটের বড় কারণ।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজ, এম আকন্দ কামিল মাদ্রাসা, নেত্রকোনা উচ্চবিদ্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সকালে ক্লাস শুরুর আগে ও বিকেলে ছুটির সময় যানজট বেশি হয়। এ সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের সড়কে ইজিবাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়, যা যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাতপাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন, অল্প দূরত্বের পথেও যানজটে পড়ে অনেক সময় চলে যায়। ইজিবাইকগুলো যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এভাবে চলতে থাকলে শহরে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই কঠিন হয়ে যাবে।

উদ্যোগ আছে, সমাধান নেই

নেত্রকোনা শহরের যানজট কমাতে অতীতেও বিভিন্ন সময় ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড তৈরি, সড়কের ওপর পার্কিং বন্ধ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সময় কিছু তৎপরতাও দেখা গেছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় কিছুদিন পর আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে।

জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান বলেন, শহরে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকা, যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং রাস্তার পাশে বাজার বসার কারণে যানজট হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে শুধু পুলিশ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

নিবন্ধনহীন এবং বাইরের ইজিবাইক যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রথম আলোকে জানান নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন।