মিহাদ ও মায়ামনির পরিবারে মাতম

ছেলে ও মেয়েকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা জয়নাল মিয়া। আজ রোববার সকালে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়াপাড়া গ্রামেছবি: প্রথম আলো

ছেলে মিহাদ (১২) ও মেয়ে মায়ামনিকে (১০) হারিয়ে শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না মা-বাবা। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা, বাবা আহাজারি করছেন। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। পরিবারের স্বপ্ন, হাসি আর ভবিষ্যৎ যেন মুহূর্তেই থেমে গেছে।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়াপাড়া গ্রামের জয়নাল মিয়ার বাড়িজুড়ে এমন আহাজারি। গতকাল শনিবার বিকেলে ভাসমান সেতু ভেঙে ব্রহ্মপুত্র নদে ডুবে তাঁর ছেলে ও মেয়ের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ঝালুরচর এলাকার শের আলী ও বেলতলী এলাকার হাবিবুল্লাহর বাড়িও শোকে স্তব্ধ। শের আলীর ছেলে আবদুল মোতালেব (৬) ও মেয়ে খাদিজা (১২) এবং হাবিবুল্লাহর ছেলে আবির হোসেনও (১৪) এ দুর্ঘটনায় মারা যায়। আজ রোববার সকালে পৃথক জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

রোববার সকালে জয়নাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে একসঙ্গে ছেলে-মেয়ের লাশের খাটিয়া রাখা। বাবা জয়নাল ঘরের বিছানায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। মা মর্জিনা বেগম ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সন্তানদের লাশের দিকে তাকিয়ে আহাজারি করছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। জয়নাল মিয়া কৃষক। তাঁর তিন সন্তান। দুর্ঘটনায় তাঁর বড় ছেলে ও মেজ মেয়েকে হারিয়েছেন। সে সময় ছোট মেয়ে জাকিয়াকে (২) নিয়ে তিনিও পানিতে পড়ে যান। তাকে নিয়ে কোনোভাবে সাঁতরে পাড়ে উঠলেও বাকি দুই সন্তান নিখোঁজ হয়।

পাঁচটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সেতুটি নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। ঈদের দুই দিন আগেও সেটি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। সেতুটি বন্ধ করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি; বরং ঝুঁকি জেনেও সেতুটি চলাচলের জন্য খোলা রাখা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন

জয়নাল মিয়ার ভাতিজা আবদুল আলিম বলেন, ‘ঈদের দিন বিকেলে আমার চাচা তিন সন্তানকে নিয়ে ওই সেতুর পূর্ব পাশের একটি পার্কে ঘুরতে যান। ফেরার পথে এই ঘটনা ঘটে। সবাই পানিতে ডুবে যায়। চাচা শুধু তার ছোট মেয়েকে উদ্ধার করতে পেরেছিল।’ তিনি আরও বলেন, সেতুটি ঈদের আগেও ভাঙা ছিল। পাশের ওই পার্কের জন্য সেতুটি কোনোরকমে মেরামত করা হয়েছিল, যাতে দর্শনার্থীরা পার্কে যেতে পারে। একসঙ্গে অনেক মানুষ সেতুতে ওঠায় দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর অভিযোগ, পার্ক কর্তৃপক্ষ কেন নড়বড়ে করে সেতুটি আবারও যুক্ত করল? এই ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহ নদের পূর্ব পাশে তাঁর একটি বৈঠকখানা বানান। ওই বৈঠকখানায় যাতায়াতের জন্য ২০১৬ সালে নদের ওপর একটি প্রথম ড্রামের ওপর কাঠের ভাসমান সেতু নির্মাণ করেন। সেতুটি ভেঙে গেলে ২০২২ সালে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ স্টিলের কাঠামো ও ড্রাম দিয়ে ভাসমান সেতু নির্মাণ করে। সম্প্রতি সেতুটি ভেঙে যায়। এর পর থেকে সেটি ভাঙা অবস্থাতেই ছিল। কিন্তু নদের পূর্ব পাশে মালিহা ইকোপার্ক নামের একটি বিনোদনকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ ঈদের আগে সেতুটি কোনোরকমে ঠিক করে।

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. সুহেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেতুটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় পৌরসভা থেকে সেতুর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সেতুটি পুরোই ভেঙে যায়। এরপর যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ঘটনার আগের দিন পর্যন্ত আমরা জানতাম, সেতুটি ভাঙা অবস্থায় আছে। পরে ওই দুর্ঘটনার পর জানতে পারি কে বা কারা আবারও সেতুটির সংযোগ দিয়েছে।’

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। আজ তদন্ত কমিটির কাগজটি হাতে পেয়েছি। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ওই সেতু পৌরসভার। ভাঙা অবস্থায় ছিল। কারা আবারও সেতুটির সংযোগ দিয়েছে, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি।’