৫০ বছরের মধ্যে খুলনার পানি সমুদ্রের মতো লবণাক্ত হতে পারে: আইনুন নিশাত

তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলনে বক্তব্য দেন পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। সিএসএস আভা সেন্টার, খুলনা, ২৫ জানুয়ারিছবি: প্রথম আলো

পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে খুলনা শহরের পানি সমুদ্রের পানির মতো লবণাক্ত হয়ে যেতে পারে। সুন্দরবনে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন দেখা দেবে। সুন্দরীগাছ কমে গিয়ে গরানগাছের আধিপত্য বাড়বে। লবণসহিষ্ণু কীটপতঙ্গসহ জীববৈচিত্র্যে বড় রকমের পরিবর্তন আসবে। প্রচলিত ফসল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। তাই পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিন রোববার মূল বক্তা হিসেবে আইনুন নিশাত এ কথা বলেন। খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে আয়োজিত ১৪টি বিষয়ভিত্তিক সেশনে শিক্ষার্থী, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারণে যুক্ত ব্যক্তি ও সাংবাদিকেরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশের উপকূল ও পানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন তথ্য, মাঠের অভিজ্ঞতা আর নীতিগত ভাবনা তুলে ধরেন।

আইনুন নিশাত উপকূলীয় বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে এবং পানির উৎসগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সাম্প্রতিক এক ঘূর্ণিঝড়ের উদাহরণ দিয়ে আইনুন নিশাত বলেন, সেখানে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ১৭ ফুট। একই ধরনের জলোচ্ছ্বাস যদি বাংলাদেশে আঘাত হানে, তাহলে পানি ফরিদপুর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, মহানগর এলাকায় পানির সমস্যা সমাধানে ওয়াসা এবং পৌর এলাকায় ডিপিএইচই কাজ করলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পানযোগ্য পানির সংকট মোকাবিলায় আলাদা কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। সীমান্তবর্তী নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।

আলোচনায় উপকূলীয় এলাকায় পানির সংকট ও লবণাক্ততা মোকাবিলার উপায়-ডিস্যালিনেশন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও নিরাপদ পানির প্রযুক্তি, পানির মান ও দূষণের ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব, বন্যা, ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকি বিশ্লেষণে জিআইএস ও ডিজিটাল মডেলিং, নগর ও পৌর পানি ব্যবস্থাপনা, নদী অববাহিকা শাসন ও প্রকৃতিভিত্তিক অভিযোজন, এসডিজি ৬-এর বাজেট ট্র্যাকিং ও নীতিগত দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য, কল্যাণ ও নেতৃত্বে নারীদের ওপর পানির সংকটের বাড়তি চাপের বিষয়টি উঠে আসে। পাশাপাশি কমিউনিটি নেতৃত্বে মিঠাপানির শাসনব্যবস্থা, জলবায়ুসহনশীল ওয়াশ সেবা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ এবং উপকূল ও সমুদ্রগামী জেলে সম্প্রদায়ের পানিনির্ভর মানবিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

উদ্বোধনী প্লেনারি সেশনে সভাপতিত্ব করেন ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম। তিনি পরিবর্তনশীল জলবায়ু পরিস্থিতিতে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণা, কমিউনিটির অভিজ্ঞতা ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারের মধ্যে সংযোগ তৈরির ওপর জোর দেন।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক পানি-সংক্রান্ত সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। নিরাপদ পানির সংকট যেমন ভয়াবহ, তেমনি কৃষি ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের পানির অভাবও মারাত্মক আকার নিয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এলাকার বেশির ভাগ পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিকল্প না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছে। যার ফলে শারীরিক ও মানসিক নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

সম্মেলনে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, সুন্দরবন একাডেমির অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির, ডর্পের মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান ও একশনএইড বাংলাদেশের আবুল কালাম আজাদ মূল বক্তব্যের পর আলোচনায় অংশ নেন।