ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনটি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তবে নির্বাচনী মাঠে আছেন বিএনপির দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও ‘বিদ্রোহী’ এক প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন আরেক বহিষ্কৃত নেতা।
জোনায়েদ সাকিসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ১০ জন প্রার্থী। তাঁরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মো. মহসীন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মো. সফিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাইদউদ্দিন খান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. হাবিবুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদের সফিকুর ইসলাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) কে এম জাবির, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের মো. আবু নাসের এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা পদ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল খালেক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি বিএনপি নেতা মো. সাইদুজ্জামান কামাল।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতির পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন আরেক প্রার্থী মেহেদী হাসান। যাচাই-বাছাইয়ে ১ শতাংশ ভোটার তালিকা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় মেহেদী হাসানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এরপরই আবদুল খালেককে সমর্থন দেন মেহেদী হাসান।
উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, বাঞ্ছারামপুরে বিএনপির নেতৃত্ব ও কমিটি নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ আছে। একপক্ষে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়া আবদুল খালেক। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে পলাশ (দল থেকে বহিষ্কৃত)। দুজনই দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর উপজেলা সদরের প্রতাপগঞ্জ বাজারে উপজেলা ও পৌর বিএনপির সম্মেলন বাতিলের দাবিতে দুই নেতার পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে বিএনপির অন্তত ৫০ নেতা-কর্মী আহত হন। জোনায়েদ সাকি জোটের প্রার্থী হতে পারেন—এমন খবরে একাংশের নেতা-কর্মীরা গত বছরের অক্টোবরে ঝাড়ুমিছিলসহ একাধিক কর্মসূচি করেন।
৩ জানুয়ারি দুপুরে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হয়। এ সময় ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় মেহেদী হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য দেওয়ান মো. নাজমুল হুদা, স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ মুর্তজা আলী ও মোহাম্মদ আবু কায়েস সিকদারের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তবে মনোনয়নপত্র টিকে যায় সাবেক এমপি আবদুল খালেকের। এরপর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষ থেকে একসঙ্গে বের হন আবদুল খালেক ও মেহেদী হাসান। তখন তাঁরা সাংবাদিকদের সামনে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন।
ওই দিন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আবদুল খালেক বলেন, ‘বাঞ্ছারামপুর বিএনপির ঘাঁটি। ২৫ বছর ধরে আমি মাঠে আছি। ২০০১ সাল থেকে নির্বাচন করে আসছি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকে নিয়ে প্রথম মনোনয়ন দেন এবং সেই নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। জনগণ আমাকে পছন্দ করেন। হঠাৎ করে একজনকে এখানে মনোনয়ন দেওয়া হলো। তিনি এখানে জয়ী হবেন না। তাঁর জনসমর্থন নেই।’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা ও তৃণমূল বিএনপি আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা একত্র থাকলে মনে হয় না অন্য কেউ এই আসনে জয় পাবেন।’
মেহেদী হাসান বলেন, ‘তৃণমূলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা স্বতন্ত্র নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি উপজেলা ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা পাশে থাকবেন। বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমরা জয়লাভ করব।’ এ সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, প্রশ্ন করলে বলেন, ‘সেটা আমরা বলতে পারব না। কারণ, কেন্দ্র থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি; কিংবা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। কেন্দ্র আমাদের নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়েছে। দলে থাকলে আমরা নির্বাচন করতে পারতাম না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির দুজন নেতা বলেন, বাঞ্ছারামপুরে আবদুল খালেক ও মেহেদী হাসানের আলাদা ভোটব্যাংক আছে। পাশাপাশি সাইদুজ্জামান কামালের পক্ষেও একাংশের নেতা-কর্মীরা সক্রিয়। জামায়াতও ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে জোনায়েদ সাকির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবেন মেহেদী হাসানের সমর্থন পাওয়া আবদুল খালেক।
গণসংহতি আন্দোলনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সংগঠক মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মুসাসহ দলটির অনেক নেতা-কর্মী তাঁদের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা জোনায়েদ সাকির পক্ষে থাকার বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ দুজনের একজোট হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, আবদুল খালেককে ডেকেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তাঁরা আশা করছেন, বিএনপির প্রবীণ এই নেতাসহ উপজেলা বিএনপির সবাই গণসংহতি আন্দোলনের নেতার পক্ষ হয়ে কাজ করবেন।’