প্রিয় শিক্ষককে ঘোড়ার গাড়িতে বাসায় পৌঁছে দিলেন সতীর্থ ও শিক্ষার্থীরা
সকাল গড়িয়ে দুপুর আসতেই অন্য রকম এক উৎসবের আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণটি। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা ভিড় করতে থাকেন প্রাঙ্গণে। এ আয়োজন টানা ৩১ বছরের বেশি সময় ধরে একই বিদ্যালয়ে পাঠদান শেষে অবসরে যাওয়া বিদ্যালয়টির একজন শিক্ষককে ঘিরে। তাঁকে বিদায় জানাতে ওই শিক্ষকের সতীর্থ-শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গণ সাজিয়ে তোলেন। পরে রাজকীয় আয়োজনে ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের শহরে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক রানু গোপাল রায় ২ এপ্রিল কর্মদিবস শেষে অবসরে গেছেন। সহকারী শিক্ষক হয়ে ওই উচ্চবিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। ৩১ বছর দুই মাস চাকরি শেষে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসরে গেছেন তিনি। তাঁর এই অবসরকে রঙিন ও প্রাণবন্ত করে তুলতে বিদ্যালয়ের এসএসসি ২০২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আজ বুধবার দুপুরে এই রাজকীয় বিদায়ের আয়োজন করেন। ঘোড়ার গাড়ির আগেপিছে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে ছিলেন আরও শতাধিক শিক্ষার্থী।
শিক্ষক রানু গোপাল রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজকে তারা (শিক্ষার্থীরা) যে আয়োজন করেছে, এটা অভূতপূর্ব। যে আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, শিক্ষকতা না করলে বা অন্য কোনো পেশায় থাকলে মনে হয় না আমি এই সম্মান, এই ভালোবাসা পেতাম। আমার কাছে আজকে সবচেয়ে বড় আনন্দের হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান করেছিলাম, সেই একই প্রতিষ্ঠান থেকে আজ অবসরে গিয়েছি।’
কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয়, আয়োজক শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ২২ জানুয়ারি কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন রানু গোপাল রায়। তারপর দেখতে দেখতে দীর্ঘ একটা সময় পেরিয়ে গেছে। যোগদান করেছিলেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক। সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবেই ২ এপ্রিল শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেছেন এই শিক্ষক। সেদিন বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে বিদায় জানানো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের এই শিক্ষকের অমন চুপচাপ বিদায়ে একধরনের অসন্তুষ্টি ছিল অনেকের। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়ের ২০২২ ব্যাচের এসএসসির শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসেন। তাঁরা আজ দুপুরে আয়োজন করেন জাঁকজমকপূর্ণ এক বিদায় সংবর্ধনার। এই আয়োজনে যেমন বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়, তেমনি অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও জড়ে হন শিক্ষাঙ্গনে। জড়ো হন অনেক অভিভাবক। শিক্ষকের আগমনের মুহূর্তে ব্যান্ড বাজিয়ে ও ফুল দিয়ে বরণ করা হয়।
এরপর ছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন কদমহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ওই শিক্ষকের প্রাক্তন ছাত্র এবং সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মো. মোনাহিম কবীর।
অন্যদের মধ্যে আলোচনা করেন প্রাক্তন ছাত্র সৈয়দ আশফাক আহমদ, জহির আহমদ, এসএসসি ২০২২ ব্যাচের ইমরান তালুকদার প্রমুখ। আলোচকেরা ওই শিক্ষকের কর্মজীবনে ছাত্রদের প্রতি তাঁর দরদ, স্নেহ-ভালোবাসা ও পাঠদানের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এসএসসি ২০২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমরান তালুকদার বলেন, ‘স্যার খুব ভালো ছিলেন। ৩১ বছর এই স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন, এলাকায় তাঁর অনেক ছাত্র। আজকে (বুধবার) অনেকেই তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন।’
আয়োজকেরা জানান, আলোচনা শেষে বিদায়ী শিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারকসহ বিভিন্ন উপহার তুলে দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় অন্য রকম এক যাত্রা। আগে থেকেই অনেকটা ‘দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর’Ñএ রকম রঙিন বেলুনে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। বিদায়ের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা আবারও প্রিয় শিক্ষককে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতি হাত নেড়ে নেড়ে প্রস্তুত ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে ওঠেন রানু গোপাল রায়। ঘোড়ার গাড়ি পাকা সড়ক ধরে মৌলভীবাজার শহরের দিকে ছুটতে থাকে। আগেপিছে মোটরসাইকেল ও অন্য যানবাহনে করে আরও শত শিক্ষার্থী চলেন সঙ্গে সঙ্গে। মৌলভীবাজার শহরের গির্জাপাড়া এলাকায় গিয়ে থামে ঘোড়ার গাড়িটি। শিক্ষকের বাসায় তখন শিক্ষার্থীদের ভিড়। এ অন্য এক আনন্দঘন মুহূর্ত।
রানু গোপাল রায় জানালেন, তিনি নিঃসন্তান। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। সন্তান না থাকার বোধ আর কাজ করে না। এই শিক্ষার্থীরাই তাঁর সন্তানের মতো। তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। শ খানেক শিক্ষার্থী আমাকে বাসায় এসে দিয়ে গেছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।’