রাজশাহী শহরে অভিনব কায়দায় বিএনপি–জামায়াতের আচরণবিধি লঙ্ঘন

আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝোলানো হয়েছে ফেস্টুন। গত শনিবার রাজশাহী নগরের বার রাস্তায় এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

আলোকায়নের জন্য বসানো সড়কবাতির খুঁটির সঙ্গে চিকন একটি বাঁশের লাঠি বেঁধে তাতে টানানো হয়েছে নির্বাচনী ফেস্টুন। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ফেস্টুনটি বাঁশের খুঁটিতেই লাগানো। কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায়, ওই বাঁশটি আসলে জি-আই তার দিয়ে বাঁধা রয়েছে বৈদ্যুতিক বাতির খুঁটির সঙ্গেই। একই কৌশলে বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ ও গাছের ডালেও ঝুলছে প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুন।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষের লোকজন নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি বা কর্তৃপক্ষের স্থাপনাগুলোয় এবং বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ, রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনাসহ কোনো যানবাহনে লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন সাঁটাতে পারবেন না। এমনকি রঙিন ব্যানার-ফেস্টুনও নিষেধ করা হয়েছে।

কিন্তু রাজশাহী-২ (সদর) আসনে অভিনব কৌশলে সেই বিধি পাশ কাটানোর চিত্র দেখা গেছে। এমনভাবে ফেস্টুন ঝোলানো হয়েছে, যাতে কাগজে-কলমে আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয়। গত দুই দিন রাজশাহী শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শুধু খুঁটি বা গাছেই নয়, নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর গোলচত্বরে বড় আকারের ব্যানার লাগানো হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ছাড়া ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে নির্বাচনী কার্যালয় বানানোর অভিযোগ উঠেছে।

এই আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান (মিনু) ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের মধ্যে। পুরো এলাকায় তাঁদের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনের আধিপত্য দেখা গেছে। কোথাও অভিনব কৌশলে, কোথাও সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

‘আলোকোজ্জ্বল শহর’ হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে নির্বাচন মৌসুমে সেই আলোর খুঁটিতেই ঝুলছে প্রচারপত্র। নগরের ফুদকিপাড়া এলাকায় দেখা গেছে, একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বিএনপি ও জামায়াতের উভয় প্রার্থীই আলাদা করে চিকন বাঁশ বেঁধে ফেস্টুন ঝুলিয়েছেন। নাদের হাজীর মোড় এলাকায় গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে একাধিক ফেস্টুন টানানো হয়েছে। একই এলাকায় সড়কের মাঝখানের বিভাজকের ওপর থাকা বাতির খুঁটির পাশে বাঁশের খুঁটি বেঁধে ঝুলছে প্রচারণাসামগ্রী।

এলাকায় হেঁটে যাওয়া পথচারী এবং এই আসনের একজন ভোটার বলেন, ‘এরা খুব সূক্ষ্মভাবে খুঁটিতে ফেস্টুন লাগিয়েছে। পাল্লাপাল্লি করে আবার গাছেও লাগিয়েছে। টেলিভিশনে দেখিয়েছে, এই জায়গাগুলোয় এগুলো লাগানো যাবে না। যাঁরা এখন এটা মানেন না, তাঁরা নির্বাচিত হলে কী করবেন, সেটাই প্রশ্ন।’

চন্দ্রিমা থানাধীন বারো রাস্তার মোড়টি নগরের একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা। এখানে চার রাস্তার আটটি লেন মিলিত হয়েছে। এই চত্বরে একাধিক বড় আকারের ব্যানার টানানো হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি এখানে একাধিক রঙিন ব্যানার লাগিয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে আগে দুর্ঘটনা বেশি ঘটত বলে কোনো সাইনবোর্ড লাগাতে দিত না এলাকাবাসী। এখন বড় বড় ব্যানার লাগানো হয়েছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সড়কের ওপর তৈরি করা হয়েছে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থী ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারকেন্দ্র। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর মোড়ে
ছবি: প্রথম আলো

এর কিছুটা সামনে দায়রাপাক মোড়েও একই চিত্র। গোলচত্বরে এমনভাবে ব্যানার লাগানো হয়েছে যে এক দিক থেকে আসা গাড়ি অন্য দিকের যানবাহন দেখতে পায় না। মোটরসাইকেল চালক মো. সিজান আলী বলেন, ‘গোলচত্বরে ঢোকার সময় ওপাশ থেকে কোনো গাড়ি আসছে কি না, বোঝা যায় না। দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে।’

ভদ্রা এলাকাসহ নগরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে চত্বরগুলো। নগরের তালাইমারী মোড়েও একই চিত্র। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখল করে উভয় দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী কার্যালয় স্থাপন করেছেন। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সামনে ফুটপাত দখল করে কার্যালয় করেছে জামায়াত। পাশেই রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে কার্যালয় বানিয়েছে বিএনপি।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আফিয়া আখতারকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি।

জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সারোয়ার জাহান বলেন, ‘আমাদের কিছু কর্মী হয়তো না বুঝে গাছে কিংবা খুঁটিতে ফেস্টুন লাগিয়েছে। আচরণবিধি অনুযায়ী, এগুলো নামিয়ে ফেলা হবে।’

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় হয়তো অগোচরে ব্যানার লাগানো হয়েছে। ইতিমধ্যে বিষয়গুলো নজরে এসেছে। নির্বাচন অফিস থেকেও জানানো হয়েছে। আমরা কোনো রকম আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে চাই না।’