ছয় দিন সাগরে ভেসে ছিল এফভি কুলসুমা, শেষ দিনে জালে ২৬ লাখ টাকার ইলিশ

ঘাটে ভিড়েছে ট্রলার এফভি কুলসুমা। সঙ্গে সঙ্গে মাছ নামানোর কাজে লেগে পড়েন জেলেরা। গতকাল সকালে কক্সবাজারের নুনিয়াছটা ঘাটেছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ঘাটে নোঙর করেছে এফভি কুলসুমা নামের মাছ ধরার ট্রলার। গতকাল সোমবার সকাল আটটার দিকে দীর্ঘ সাত দিন সাগরে কাটিয়ে ফিরে আসে ট্রলারটি। কিছুক্ষণ পর জেলেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মাছ বের করার কাজে। ইলিশ, পোপা, মাইট্যা, রুপচাঁদাসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ ট্রলারের ডেকে রাখা হচ্ছিল। তারপর ঝুড়িতে ভরে সেই মাছ নেওয়া হচ্ছিল পাশের ফিশারিঘাটের পাইকারি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে।

ফিশারিঘাটে আনার পর কয়েকজন ব্যবসায়ী ট্রলারের ২ হাজার ২০০ ইলিশ কিনে নেন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। প্রতিটি ইলিশের ওজন ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। বিক্রির পর পর সেই ইলিশ বরফমিশ্রিত কার্টনে ভরে ট্রাকে বোঝাই করেন শ্রমিকেরা। দুপুরে ঢাকার পথে রওনা দেয় ট্রাকটি।

এফভি কুলসুমায় ইলিশ ধরা পড়ার খবর ততক্ষণে ফিশারিঘাটের সবার মুখে মুখে। মৌসুমে এত মাছ খুব কমই ধরা পড়েছে। কুলসুমা ট্রলারের জেলেরাও খুশি। ইলিশ দ্রুত বিক্রি হওয়ায় টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে পারবেন জেলেরা। ট্রলারটির ১২ জন জেলে জানান, ইলিশ বিক্রি থেকে তাঁরা প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকার মতো পাবেন। এক মৌসুমের খোরাকির জন্য এই টাকা যথেষ্ট নয়, কিন্তু এক দিনের জন্য অনেক।

এফভি কুলসুমা ট্রলারের মালিক শহরের নুনিয়াছটার বাসিন্দা আমান উল্লাহ(৫৪)। ৬ দিন সাগরে ভেসে শেষ মুহূর্তে তাঁরা মাছ পেয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, গত তিন মাস ধরে কক্সবাজারের জেলেরা ইলিশের দেখা পাননি। বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ, লঘুচাপ সৃষ্টির ফলে গত দুই মাস সাগরে নামাও সম্ভব হয়নি। তবে গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে কিছু ট্রলারে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে। শেষ দিকে এসে তাঁরা এত মাছ পাবেন, ভাবতেও পারেননি।

মহেশখালীর তাজিয়াকাটা এলাকা থেকে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের অন্তত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জাল ফেলে তাঁর ট্রলারের জেলেরা এই ইলিশ ধরে এনেছেন। এ পর্যন্ত এত বেশি ইলিশ কোনো ট্রলারে ধরা পড়েনি। গভীর সাগরে ইলিশ আছে, কিন্তু ছোট ট্রলার নিয়ে ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ইলিশ আহরণ ঝুঁকির কাজ।

আমান উল্লাহ বলেন, মহেশখালীর তাজিয়াকাটা এলাকা থেকে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের অন্তত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জাল ফেলে তাঁর ট্রলারের জেলেরা এই ইলিশ ধরে এনেছেন। এ পর্যন্ত এত বেশি ইলিশ কোনো ট্রলারে ধরা পড়েনি। গভীর সাগরে ইলিশ আছে, কিন্তু ছোট ট্রলার নিয়ে ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ইলিশ আহরণ ঝুঁকির কাজ।

শেষ মুহূর্তে এসে মাছ পেয়ে খুশি ট্রলারের জেলে মো. আলমগীর। তিনি বলেন, টানা পাঁচ দিন ট্রলারের ১২ জন জেলে সাগরের বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলে ইলিশের নাগাল পাননি। ষষ্ঠ দিন মহেশখালী উপকূলে জাল ফেলে ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরতে পেরেছেন। এসব ইলিশ তাঁদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে তাঁরা ৫০ হাজার টাকা করে পাবেন। এই টাকা এক মৌসুমের জন্য কম হলেও, এক দিনের জন্য যথেষ্ট ভালো।

ট্রলার থেকে ফিশারিঘাটে মাছ আনার পর নিলাম শুরু হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা দ্রুত কিনে নেন ইলিশ
ছবি: প্রথম আলো

ফিশারিঘাট মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে গতকাল পাইকারিতে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৭০০ টাকায়, ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় এবং ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। বেশির ভাগ ইলিশ মাঝারি আকারের। মাঝারি আকারের অধিকাংশ ইলিশের পেটে ডিম রয়েছে বলে জানান জেলে ও ব্যবসায়ীরা।

ফিশারিঘাটে গতকাল ২৭ জন মাছ ব্যবসায়ীকে পাওয়া গেল, যাঁরা ইলিশ কিনে বরফ দিয়ে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। তাঁরা জানান, গত কয়েক দিনে সাগর থেকে অন্তত তিন শতাধিক ট্রলার ফিশারিঘাটে এসেছে। প্রতিটা ট্রলারের জালে ধরা পড়েছে ২০০ থেকে ৩০০টি ইলিশ। সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়েছে আমান উল্লাহর এফভি কুলসুমায়। ঘাটে ইলিশের ট্রলার আসায় তাঁদের ব্যস্ততা বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠন কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত দুই মাস জেলেরা সাগরে নামতে পারেনি, সাগরে মাছও নেই। তবে গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরা পড়েছে এফভি কুলসুমায়।

মাছ কেনার পর সেগুলো সরবরাহ করার পালা। এ জন্য বরফভর্তি কার্টনে মাছ রাখছেন একজন শ্রমিক
ছবি: প্রথম আলো

উৎপাদন কমছে

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, জেলার ছোটবড় ৬ হাজার ট্রলারের মধ্যে ৪ হাজার ঘাটেই পড়ে আছে। অবশিষ্ট ২ হাজার ট্রলার সাগরে নামলেও ইলিশসহ অন্যান্য মাছ তেমন ধরা পড়ছে না। তাতে ট্রলারের মালিক ও জেলেশ্রমিক উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সাত দিন সময়ে ট্রিপে একটি ট্রলার সাগরে নামলে খরচ হয় ৬-৭ লাখ টাকা। কিন্তু যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ে, তা বিক্রি করে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পাওয়া যায়। লোকসান গুনতে গুনতে বহু মালিক ট্রলার বিক্রি করে দিচ্ছেন। জেলায় জেলের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছেন।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামুদ্রিক দূষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, নদী ও সাগর উপকূলে প্লাস্টিক, ছেঁড়া জাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এসব খেয়ে বা জালে জড়িয়ে মাছ-চিংড়ি কাছিমসহ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে। ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বেড়েছে অনেক, যে কারণে মাছের ডিম ও পোনাও মারা যাচ্ছে। সাগরে যে পরিমাণ মৎস্য মজুত রয়েছে, আহরণ হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এ কারণে সাগরে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে।

শেষ মুহূর্তে এসে মাছ পেয়ে খুশি ট্রলারের জেলে মো. আলমগীর। তিনি বলেন, টানা পাঁচ দিন ট্রলারের ১২ জন জেলে সাগরের বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলে ইলিশের নাগাল পাননি। ষষ্ঠ দিন মহেশখালী উপকূলে জাল ফেলে ২ হাজার ২০০ ইলিশ ধরতে পেরেছেন। এসব ইলিশ তাঁদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে তাঁরা ৫০ হাজার টাকা করে পাবেন। এই টাকা এক মৌসুমের জন্য কম হলেও, এক দিনের জন্য যথেষ্ট ভালো।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের দেওয়া তথ্যমতে, পাইকারি মাছ বিক্রির এই বাজারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট মাছ অবতরণ হয়েছে ২ হাজার ৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ ৫২২ টন, রুপচাঁদা ২৩ টন, ম্যাকরেল ১১৪ টন এবং রিঠা ১৩৭ টন।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মাছ অবতরণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৫৮ টন। এর মধ্যে ইলিশ ১ হাজার ৬২৮ টন। গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাছ আহরণ মাঝেমধ্যে বেড়েছে, বেশির ভাগ সময় কমেছে। বিশেষ করে ইলিশ।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ফিশারিঘাটের মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ছাড়াও জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়াতে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ বেচাবিক্রি হয়। গত অর্থবছরে ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ আহরণ হয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের গত দুই–আড়াই মাসে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশও আহরণ হয়নি।