পাবনায় শিক্ষার্থী–অভিভাবকদের প্রশ্ন, কলেজের কোটি টাকা গেল কই
পাবনার সুজানগরে সরকারি ডাক্তার জহুরুল কামাল ডিগ্রি কলেজের ১৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে এক কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান শহিদুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। আজ সোমবার দুপুরে তাঁরা কলেজের সামনে দুলাই বাজার এলাকায় পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন থেকে কলেজের টাকা গেল কই এমন প্রশ্ন তুলে তাঁরা ঘটনার তদন্ত দাবি জানান।
দুপুর ১২টার দিকে দুলাই বাজার এলাকায় পাবনা-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান নেন কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকাবাসী। প্রথমে তাঁরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। এরপর পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচি থেকে কলেজের টাকা ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষক ও অভিভাবকেরা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টাকা কোনোভাবেই অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা গ্রহণযোগ্য নয়। কলেজের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাঁরা দ্রুত ঘটনার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন।
জনতা ব্যাংক দুলাই শাখায় সরকারি ডাক্তার জহুরুল কামাল ডিগ্রি কলেজের ৪৪টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ১৪টি অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টে কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের আলামত পাওয়া গেছে।
কলেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হয়। কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি), স্নাতক (পাস) কোর্স ও ৬টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। শিক্ষার্থী আছে প্রায় দুই হাজার। জনতা ব্যাংক দুলাই শাখায় কলেজটির ৪৪টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। অধ্যক্ষের স্বাক্ষরে ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন কলেজের হিসাবরক্ষক। ১০ সেপ্টেম্বর সকালে হিসাবরক্ষককে ২২ হাজার ৫০০ ও ২৯ হাজার ৯০০ টাকার দুটি চেক দেন হিসাবরক্ষক। বিকেলে তিনি মুঠোফোনে ২ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলনের খুদে বার্তা পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে ফোন দেন। পরে ব্যাংকে গিয়ে দেখতে পান চেকে দেওয়া স্বাক্ষর তাঁর নয়। তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান এবং ব্যাংকের ১৪টি অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টে কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের আলামত পান। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়।
এ ঘটনায় গতকাল রোববার চার সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনাটি বেশ জটিল। কলেজের অনেকগুলো অ্যাকাউন্ট। অনেকভাবে টাকা তোলা হয়। আজ সোমবার থেকে বিষয়টি অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ সবার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি।শহিদুর রহমান, তদন্ত কমিটির প্রধান
তদন্ত কমিটির প্রধান শহিদুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি বেশ জটিল। কলেজের অনেকগুলো অ্যাকাউন্ট। অনেকভাবে টাকা তোলা হয়। আজ সোমবার থেকে বিষয়টি অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ সবার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি।’
কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাফ্ফর হোসেন মুন্সি জানান, ঘটনার পর অধ্যক্ষ ব্যাংকের কোনো সহযোগিতা পাননি। যেসব চেক থেকে টাকা উত্তোলন হয়েছে, সেসব চেক ব্যাংক দেখায়নি। এতে মনে হচ্ছে চেকদাতা ও ব্যাংকের কেউ যোগসাজসে কাজটি করেছেন।
অধ্যক্ষ আবদুল মজিদ বলেন, ‘কলেজের টাকা হিসাবরক্ষক তোলেন। প্রাথমিকভাবে আমরা দেখেছি কলেজের প্রায় ১৪টি হিসাব থেকে কোটি টাকার ওপরে আত্মসাৎ হয়েছে। যেহেতু টাকা হিসাবরক্ষক তুলেছেন, সেহেতু দায়টা তাঁর ওপরই বর্তায়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে কলেজের হিসাবরক্ষক গিয়াস কামাল বলেন, ‘ব্যাংক থেকে টাকা তুললে অধ্যক্ষর ফোনে এসএমএস আসে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চেক যাচাই–বাছাই করেই টাকা দেয়। এখানে আমার ওপর মিথ্যা দায় চাপানোর কোনো সুযোগ নেই।’
এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংক দুলাই শাখার ব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক বলেন, ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কারও জড়িত থাকার সুযোগ নেই। কারণ, প্রতিটি চেক যাচাই–বাছাই করেই টাকা দেওয়া হয়। লেনদেনের প্রতিটি অ্যামাউন্ট (পরিমাণ) অধ্যক্ষর মুঠোফোনে মেসেজ (খুদে বার্তা) যায়। গত ডিসেম্বর ও জুলাই মাসে অধ্যক্ষকে প্রতিটি হিসাবের স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এখন ওনারাই বলতে পারবেন কী হয়েছে।